কারবালার শিক্ষা ও আমাদের বাস্তবতা

116

মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন : কারবালা-ই-মোআল্লা বাগদাদের কাছে ফোরাত নদীঘেরা এক প্রসিদ্ধ শহর, যেখানে মাশহাদুল হোসাইন (রা.) এবং আহলে বাইতের সদস্যদের শাহাদতের মাধ্যমে হক-ন্যায় ও সুমহান আদর্শ কায়েমের এক পরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছিল।

প্রাচীনকালের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিশ্লেষণে কারবালা পানির দুষ্প্রাপ্যতা ও পাহাড় পরিবেষ্টিত এলাকা হিসেবে পরিচিত থাকলেও ৬১ হিজরির (৬৮০ খ্রিস্টাব্দের) ১০ মহররম সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডা ধরতে হোসাইনের (রা.) শাহাদতের ঘটনার জন্য সারা দুনিয়ার হক ও ন্যায়পন্থী মুসলমানদের কাছে কারবালা এক পবিত্র নগরীতে পরিণত হয়েছে। কারবালায় অবস্থিত হজরত হোসাইন (রা.) ও হজরত আব্বাসের (রা.) মাজারের স্বর্ণ ও কারুকার্যখচিত সুউচ্চ উজ্জ্বল মিনারগুলো যেন আজও হাজার বছর আগের হক ও বাতিলের ফয়সালার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আহলে বাইতে রাসূল (সা.) ও নবী দৌহিত্র হোসাইনের (রা.) ঈমানি রক্তে সিক্ত সে পবিত্র শাহাদতি জমিন কোটি কোটি মুসলমানকে হক পথে অবিচল থাকার প্রেরণা জোগায়। এজন্য শাহাদতে কারবালার প্রত্যক্ষ ঘটনা বর্ণনাকারী লেখক আবু মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়া আযদী তার জগদ্বিখ্যাত ‘মাকতালুল হোসাইন’ গ্রন্থে বলেছেন, কারবালা যে কারণে দুনিয়াজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছে তা হল ৬১ হিজরির ১০ মহররম আশুরার দিনে হোসাইন (রা.) ও তার সাথীদের কোরবানি তথা আত্মত্যাগ। হোসাইন (রা.) কারবালার জমিনে শাহাদতবরণ করবেন, এটি আল্লাহর কুদরতের সিদ্ধান্ত।

রাসূল (সা.) কারবালার জমিনের মাটি উম্মে সালমাকে (রা.) বোতলভর্তি করে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যেদিন হোসাইন (রা.) কারবালায় শহীদ হবেন, সেদিন বোতলের মাটি আর মাটি থাকবে না; রক্ত হয়ে যাবে। হাকিম হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন- ‘আমাদের মনে এ প্রসঙ্গে কিঞ্চিৎ সন্দেহও অবশিষ্ট থাকেনি এবং আহলে বাইত বা নবী পরিবার সর্বসম্মতভাবেই জানত, হোসাইন (রা.) কারবালার ময়দানে শহীদ হবেন।’ আবু নঈম হজরত ইয়াহিয়া হাদরামি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, ৩৯ হিজরিতে সিফফিনের দিকে সফরের সময় তিনি হজরত আলীর (রা.) সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, হজরত আলী (রা.) কারবালার নাম শুনে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। যখন ‘নায়নাওরা’র কাছে পৌঁছলেন (সেখানে হজরত ইউনূসের (আ.) মাজার রয়েছে) তখন আলী (রা.) ডেকে বললেন। হে আবু আবদুল্লাহ! ফোরাতের তীরে থাম! আমি আরজ করলাম আপনি আমাকে কেন এটি বলছেন? উত্তরে আলী (রা.) বললেন, নবীয়ে পাক (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল আমাকে খবর দিয়েছেন যে, হোসাইনকে (রা.) ফোরাত নদীর তীরে শহীদ করা হবে এবং আমাকে সেখানকার এক মুষ্টি মাটিও দেখিয়েছেন এবং তার ঘ্রাণ নিতে বলেছেন। এ কারণে আমার কান্না এসে যায় (আয যাহাবী : সিয়ারুল আ’লামিন নুবালা, ৩য় খণ্ড, পৃ: ১৯৪,১৯৫)।

মহররম এমন একটি মাস যাকে কোরআনুল কারিমে ‘শাহরুল হারাম’ ঘোষণা করা হয়েছে। এ মাসে ইসলামপূর্ব মূর্তিপূজক আরবরাও রক্তপাত করাকে অন্যায় মনে করত। অথচ এ মাসেই মুসলমান নামধারী ভণ্ড ইয়াজিদ বাহিনী নবী দৌহিত্র হোসাইন (রা.) ও আহলুল বাইতের সদস্যদের রক্ত ঝরিয়ে সেই প্রাচীন পবিত্রতা রক্ষার রীতি লঙ্ঘন করেছে। নবীবিদ্বেষী ইয়াজিদ ও তার পা-চাটা ২২ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী যারা দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জুব্বার লেবাস ধারণ করে সেদিন আসরের নামাজের আজান দিয়েছিল, ইকামত দিয়েছিল। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা:)’র কুপুত্র ও ইয়াজিদের প্রধান সেনাপতি উমর ইবনে সা’দের ইমামতিতে জামাতবদ্ধ হয়ে আসরের নামাজ আদায় করেছিল। নামাজে তাশাহুদ ও দরুদে ইব্রাহীমিও পড়েছিল: ‘আল্লাহুম্মা চাল্লি আ’লা মুহাম্মাদিও ওয়ালা আ’লে মুহাম্মদ’। আ’লে মুহাম্মদ’ বা মুহাম্মদ (দ.)-এর বংশধরের মর্যাদা ইয়াজিদি মুসলমানরা বোঝে না, জানে না। জানে না বলেই নামাজ-উত্তর নবী বংশধরদের হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। তাদের হত্যার নৃশংসতা থেকে ৬ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু হজরত আলী আজগর (রা.) পর্যন্ত রেহাই পায়নি। ১১ মহররম সকালবেলা ইয়াজিদিদের লাশগুলোকে একত্রিত করে ইবনে সা’দের ইমামতিতে জানাজা পড়িয়ে কবর দেয়া হয়। অথচ নবী বংশধরদের মস্তকবিহীন খোলা আকাশের নিচে ফেলে রেখে পশু-পাখির খাবারে পরিণত করা হয়। আর ১২ মহররম সকালবেলায় নবী পরিবারের শহীদি মস্তকগুলোকে বর্শায় গেঁথে কুফার রাজপথে শোভাযাত্রা বের করা হয়। শাহাদতে কারবালার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের অন্যতম উকবা ইবনে সামআম এবং দাহহাক ইবনে উবায়দুল্লাহ মাশরিকীর প্রত্যক্ষ ঘটনা অবলম্বনে ঐতিহাসিক আয যাহাবী (রহ.) তদীয় গ্রন্থে, আবু জাফর আত তাবারি (রহ.) তার তারিখুর-রুসুল ওয়াল মুলুক গ্রন্থে ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) তার আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে শাহাদতে কারবালার সত্যনির্ভর ও তথ্যবহুল আরও যেসব বেদনাবিধুর ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তার বিস্তারিত আলোচনা পাঠককে মর্মাহত করবে।

৬১ হিজরিতে শাহাদতে কারবালার মাধ্যমে মুসলমান ও ইসলামের অনুসারীরা মূলত দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। একদল সত্যের অনুসারী, অপরদল মিথ্যার বেসাতিকারী। একদল আহলে বাইতের মহব্বতকারী ঈমানদার মুসলমান, অপরদল আহলে বাইতবিদ্বেষী মেকি মুসলমান। হোসাইন (রা.) ওইসব মেকি মুসলমানদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছিলেন। এরা ছিল ইয়াজিদের বেতনভোগী, দুনিয়ালোভী পাশবিক মুসলমান, যাদের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ২২ হাজার। তাদের উদ্দেশ করেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল বলেছিলেন-

‘মুসলিম বেশে মুনাফিক দল

করিতেছে কোলাহল’

এজন্য হুসাইনি আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ইয়াজিদিদের প্রতিরোধ করা প্রয়োজন; কিন্তু কে প্রতিরোধ করবে? মুসলিম জাতি তো অঘোরে নিদ্রারত। ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে জাগ্রত করার জন্যই হোসাইন (রা.) কারবালার জমিনে নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ইসলামের সুমহান কালজয়ী আদর্শ প্রতিস্থাপন করে গেছেন। ড. ইকবাল তার কবিতায় সে কথাই ফুটিয়ে তুলেছেন-

খুনে উ তফসিরে ই আছরারেকার

মিল্লাতে খাবিদা বে দারেকার ( মুসলিম মিল্লাতের জাগরণের জন্য তিনি আত্মদান করে শহীদ হয়েছেন)।

মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন : সাবেক কলেজ শিক্ষক; বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত।