নলতা পাক রওজা শরীফের খাদেম সাহেবের দাফন সম্পন্ন, ভক্তকূলে কান্নার বন্যা

248
নলতা

কে এম রেজাউল করিম, দেবহাটা ব্যুরো : সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলাধীন নলতা শরীফে শায়িত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারক, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সুফী-সাধক, মুসলিম রেনেসাঁস অগ্রদূত, একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ, “স্রষ্টার এবাদত ও সৃষ্টের সেবা” এ মহান ব্রতকে সামনে রেখে ১৯৩৫ সালে নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা, পীরে কামেল সুলতানুল আউলিয়া কুতুবুল আকতার গওছে জামান আরেফ বিল্লাহ হজরত শাহ্ছুফী আলহাজ্জ খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (র.) এঁর মাজার শরীফের শ্রদ্ধেয় খাদেম, পীর কেবলার বিশ্বস্ত সহচর, সদালাপী, ত্যাগী, দানবীর, সমাজসেবক, পরোপকারী মৌলভী আলহাজ্জ আনছার উদ্দিন আহমদ (৮৫) এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নলতা পাক রওজা শরীফের শ্রদ্ধেয় খাদেম সাহেবের সহযোগী রেজিনা বিলকিস (৫০) কর্তৃক খাদেম সাহেব সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, কিডনি, ফুসফুস সমস্যা সহ বেশকিছু শারীরিক সমস্যায় চিকিৎসাধীন থাকার শেষ পর্যায়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ০৭ জুলাই ২০২০ রোজ মঙ্গলবার বিকাল ৩ টার দিকে সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে তার আর এক সহযোগী মাসুম বিল্লাহ (২৫) ও করোনায় আক্রান্ত হন। সে কারণে বৈশ্বিক মহামারী করোনার অব্যাহত থাবা থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে ০৮ জুলাই ২০২০ রোজ বুধবার সকালে মিশন কর্তৃপক্ষের সাথে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ব ঘোষিত আজ ০৯ জুলাই ২০২০ রোজ বৃহস্পতিবার বাদ আছরের পরিবর্তে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ভক্তবৃন্দের উপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আজ ০৯ জুলাই ২০২০ রোজ বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪ টায় নলতা শরীফ মাহফিল মাঠে মরহুমের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তারপর ফজরের নামাজ পরবর্তী ভোর ৫ টায় পূর্ব নির্ধারিত পীর আম্মার মাজার শরীফের একেবার পূর্ব পার্শ্বে পীরজাদাগণের কবরের পাশে সর্বজন শ্রদ্ধেয় খাদেম মৌলভী আলহাজ্জ আনছার উদ্দিন আহমদ এর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। জানাযার নামাজ ও দাফন কার্য পরিচালনা করেন নলতা শরীফ শাহী জামে মসজিদের খতিব আলহাজ্জ মুফতি মাওলানা মো: আবু সাঈদ জিহাদী রংপুরী।

উপস্থিত থেকে নামাজে জানাযার পূর্বে মিশনের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশনের সভাপতি ও সাবেক সফল স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলহাজ্জ অধ্যাপক ডা: আ ফ ম রুহুল হক এমপি। তিনি সংক্ষেপে খাদেম সাহেবের বৃহৎ কল্যাণকর কাজের কিছু স্মৃতিচারণ করার পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের কারণে ঝুঁকি এড়াতে সময় পরিবর্তন করে স্বল্প পরিসরে অনুষ্ঠিত জানাযার নামাজে শ্রদ্ধেয় খাদেম সাহেবের হাজার হাজার ভক্তবৃন্দকে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিতে পারায় মিশনের পক্ষ থেকে সকলের নিকট ক্ষমা চেয়েছেন।

এ সময় পীর ভবনের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের সহ-সম্পাদক আলহাজ্জ মো: মালেকুজ্জামান। খাদেম সাহেবের পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন মিশনের অন্যতম সহ-সম্পাদক ও খাদেম সাহেবের ভ্রাতা আলহাজ্জ চৌধুরী আমজাদ হোসেন। জানাযা নামাজ ও দাফন কার্যে আরো উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আবু মাসুদ, কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মোজাম্মেল হক রাসেল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালিগঞ্জ সার্কেল) মো: জামিরুল ইসলাম জামি, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুস সেলিম, থানার অফিসার ইনচার্জ মো: দেলোয়ার হুসেন, কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্জ মো: এনামুল হক খোকন, কোষাধ্যক্ষ মো: আনোয়ারুল হক, কর্মকর্তা ও মিশনের সাবেক সভাপতি আলহাজ্জ মুহাম্মদ সেলিম উল্লাহ, কর্মকর্তা আলহাজ্জ আলহাজ্জ মো: সাইদুর রহমান, আলহাজ্জ মো: ইউনুস, আলহাজ্জ আবুল ফজল, আলহাজ্জ রবিউল হক, মো: শফিকুল অানোয়ার রঞ্জু, মো: আজিজুর রহমান, আলহাজ্জ একরামুল রেজা, খায়রুল হাসান, আলহাজ্জ রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, শফিকুল হুদা, ডা: নজরুল ইসলাম, আলহাজ্জ আলমগীর হোসেন, আলহাজ্জ আনারুল ইসলাম, খাদেম সাহেবের ভ্রাতা ডা: মইনুদ্দিন, ঢাকা ইউনাইটেড হাসপাতালের মালিক আলহাজ্জ আক্তার মাহমুদ রানা, খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ইন্সটিটিউট এর মহাপরিচালক আলহাজ্জ এ এফ এম এনামুল হক, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন হেল্থ সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ, নলতা শরীফ শাহী জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মো: আশরাফুল ইসলাম আজিজী, হাফেজ মো: হাবিবুর রহমান, আলহাজ্জ কাজী জিলানী, আলহাজ্জ আনিছুজ্জামান খোকন, আলহাজ্জ গোলাম মুক্তাদির, স্থানীয় সহ কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন শাখা মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যবৃন্দ। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৬৫ সালে পীর কেবলা আলহাজ্জ হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (র.) ইন্তেকালের পর ঐবছর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত খাদেমের দায়িত্ব পালনকালে আলহাজ্জ আনছার উদ্দিন আহমদ পীর কেবলার মটো অনুযায়ী তিনি ‘স্রষ্টার এবাদত ও সৃষ্টির সেবা’ করে গেছেন মন উজাড় করে।
নলতা ইউপির পাইকপাড়া গ্রামের মৃত আলহাজ্জ মো: এজাহার হোসেন ও মোছা: জোহরাতুন্নেছার পুত্র খাদেম মৌলভী আলহাজ্জ আনছার উদ্দিন আহমদ ধর্মীয় ও মানবসেবায় কৈশোর, যৌবন তথা সারাটা জীবন উৎসর্গ করতে এতটাই অবিচল ছিলেন জীবনে সংসার করার কথা ভাবতেই পারেননি।

তার নিজের কোনো সন্তান না থাকলেও তিনি খাদেমের দায়িত্ব পালনকালে অসংখ্য এতিম, অসহায় ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়ার খরচ যুগিয়েছন। মানুষ করেছেন। করেছেন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। অনন্য অবদান রেখে গেছেন দক্ষিণ বঙ্গেন সর্ববৃহৎ ও অত্যাধুনিক বেসরকারি আহ্ছানিয়া মিশন চক্ষু ও জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্মাণে, নলতা কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন, কে বি আহ্ছানউল্লা প্রি-ক্যাডেট ও জুনিয়র হাইস্কুলে জমিদান করেন, প্রথমে নলতা হাইস্কুল মাঠের উত্তর পাশে দরিদ্র ও অসহায়দের জন্য একটি কবরস্থানের ব্যবস্থা, পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অনুযায়ী আরো বৃহৎ পরিসরে অর্থাৎ ৩ বিঘা জমির ব্যবস্থা করে নলতা চৌমুহনী প্রধান সড়কের পূর্ব পার্শ্ব এলাকায় দরিদ্র, অসহায় ও ভূমিহীদের জন্য কবরস্থানের জায়গার ব্যবস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সহযোগিতায় নলতা শরীফ সহ আশা পাশের এলাকায় সুপেয় সাপ্লাই পানির ব্যবস্থা করা, মিশনের বিভিন্ন গেস্ট হাউস, জমি ক্রয়, মসজিদ নির্মাণ সহ সমস্ত উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ, পীর কেবলার বার্ষিক ওরছ শরীফে আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিশাল সুন্নী মাহফিলে দেশ-বিদেশ থেকে স্বণামধন্য বক্তা আনয়ন, ওরছে আগত পীর কেবলার ভক্তবৃন্দের থাকা-খাওয়া সহ নানা ব্যবস্থাপনা, সফলভাবে আহ্ছানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর উদযাপন, মিশন প্রতিষ্ঠার ৮৫ বছর উদযাপনে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ (যদিও অনুষ্ঠান উদযাপনের ২/৩ দিন আগে করোনার কারণে সাময়িক স্থগিত হয়), নলতায় আগত যে কোনো ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ মেহমানদারির ব্যবস্থার মাধ্যমে অনন্য নজির স্থাপন, এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, পীর কেবলার কর্মময় জীবনের নানা দিক মিডিয়ার মাধ্যমে দেশ ও বিদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা, নলতা শরীফে পবিত্র রমজান মাসে প্রতিদিন ৭/৮ হাজার রোজাদারের উপস্থিতিতে দেশের সর্ববৃহৎ ইফতার মাহফিলে ডোনারের ব্যবস্থা, মাসব্যাপী ইফতার মাহফিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা, জীবদ্দশায় সুস্থ অবস্থায় বছরের কয়েকটি হারাম দিন ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখা এবং প্রতিদিন অসংখ্য ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে ইফতার করা, সব সময় নিজেকে মানুষের নিকট নমনীয় ও আন্তরিকতার সাথে উপস্থাপন করা, সু-শৃঙ্খল সূচীর মাধ্যমে নিয়মিত ধর্মীয় আমল করা সহ নানা গুণে গুণান্বিতের কারণে সুমিষ্টভাষী, আত্মত্যাগী মহান মানুষটি স্থানীয় সহ দেশ-বিদেশে আহ্ছানিয়া মিশন বা বিভিন্ন মহলের অসংখ্য ভক্তের মনের মনি কোটায় স্থান করে নিয়েছেন।

তাই করোনা ভাইরাসের কারণে অতি প্রিয় মানুষটির শেষ বিদায়কালে তার জানাযায় অংশগ্রহণ করতে না পেরে খাদেম সাহেবের হাজার হাজার ভক্তবৃন্দের হৃদয়ে বইছে কান্নার স্রোত। পাক রওজা শরীফের শ্রদ্ধেয় খাদেম সাহেব এমন একজন সমাদর ব্যক্তি ছিলেন যে, শ্রদ্ধেয় খাদেম হিসেবে পদাধিকার বলে মিশন পরিচালনা কমিটির ১নং কার্যকরী সদস্য হলেও যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সকলে তার উপর ন্যস্ত করে সংশ্লিষ্ট কাজটির সফল বাস্তবায়ন দেখতে পেতেন। খাদেম সাহেবের অনুপস্থিতিতে নলতা শরীফ সহ ভক্তবৃন্দের মাঝে যে শূন্যতা বিরাজ করছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কারণ তিনি নিজেই নিজের তুলনা।

আর সবকিছু থেকেও মনে হচ্ছে মাথার উপর আকাশ নেই। যা হোক মানুষ চিরদিন বেঁচে থাকবে না। পীর কেবলা ও পরবর্তীতে খাদেম সাহেবের কর্মময় জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু দিক যদি অনুসরণ করা যায় তাহলে ওনাদের উত্তরসূরীগণও আলোকিত বা সমাদৃত হবেন বলে অনেকে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে পাক রওজা শরীফের শ্রদ্ধেয় খাদেম সাহেবের মৃত্যুতে নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের সভাপতি আলহাজ্জ অধ্যাপক ডা: আ ফ ম রুহুল হক এমপি, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্জ মো: এনামুল হক খোকন সহ কেন্দ্রীয় ও শাখা মিশনের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ তথা নানা শ্রেণি পেশার মানুষ খাদেম সাহেবের আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবার বা ভক্তবৃন্দের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।

উল্লেখ্য, ০৯ জুলাই ২০২০ রোজ বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব নলতা পাক রওজা শরীফের সাপ্তাহিক মিলাদ অনুষ্ঠানে ও আগামীকাল ১০ জুলাই ২০২০ রোজ শুক্রবার বাদ জুম্মা নলতা শরীফ শাহী জামে মসজিদে শ্রদ্ধেয় খাদেম মৌলভী আলহাজ্জ আনছার উদ্দিন আহমদ স্মরণে মিলাদ শরীফ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।