কয়রায় ভিজিডি কার্ডের তালিকায় অনিয়ম, বঞ্চিত অসহায়রা

29
অনিয়ম

ওবায়দুল কবির সম্রাট, কয়রা: খুলনার কয়রা উপজেলা সদর ইউনিয়নে অসহায় দুস্থদের ভিজিডি কর্মসূচিতে গরিবদের জন্য বরাদ্ধকৃত কার্ডের নামের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুস্থ নারীদের পরিবর্তে তালিকায় অধিকাংশ স্বচ্ছল পরিবার। একাধিক ব্যক্তি এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট উদ্ধর্তন কতৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ করেও ফল পায়নি। সচেতন সুশীল সমাজের অভিযোগ, এই অনিয়মের কারণে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অগ্রগতি ক্ষুদার্ধ দারিদ্রমুক্ত সহ বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

জানা যায়,বাংলাদেশের সব ইউনিয়নের অধীনে গ্রামাঞ্চলের অসহায় -দুস্থ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মাঝে ফ্রি ভিজিডি কর্মসূচি উপকার ভোগী কার্যক্রমের ব্যবস্থা করেছে সরকার।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্য্যালয়ের তথ্য মতে, দুস্থ ও অসহায় নারীদের ২ বছরের খাদ্য নিরাপত্তা জন্য ২০২১-২২ সালের ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ৩২৫২টি পরিবারের মাঝে ৯৭.৫০০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য (চাল) বরাদ্দ হয়েছে। প্রতিটি কার্ড এর বিপরীতে মাসিক ৩০ কেজি হারে দুস্থরা এই চাল পাবেন।

ইতোমধ্যে কয়রা সদর ইউনিয়নে নয়টি ওয়ার্ডে ৬০৪ টি ভিজিডি কার্ডের অনুকূলে ১৮.১২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। প্রতিটি কার্ডে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল দেওয়ার নিমিত্তে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রেশমা আক্তার ও ৫ নং কয়রা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এইচ এই হুমায়ুন কবির সহ অন্যান্য সদস্যদের সমন্বয়ে তৈরি কার্ডধারীরা অধিকাংশরাই স্বচ্ছল বিত্তবান। তদন্ত প্রতিবেদনে এমনই অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দুস্থ ও অসহায় এর পরিবর্তে তালিকায় স্থান পেয়েছে জমির মালিক, মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী, পাকা ঘরের মালিকসহ বিত্তশালীদের নাম। এভাবে স্বচ্ছল ও বিত্তশালীদের ভিজিডি কার্ডের তালিকায় নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে আম্পান বিধ্বস্ত ইউনিয়নের জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক সমালোচনারও সৃষ্টি হয়েছ।

এব্যাপারে কয়রা সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা স্বামী পরিত্যক্তা হতদরিদ্র হালিমা খাতুন বলেন, খাস জমিতে থেকে এর বাড়ি ওর বাড়ি, যখন যে কাজ তখন তখন সেই কাজ করে, দুইটি শিশু সন্তান নিয়ে অতিকষ্টে দিন যাপন করছি। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে মাঝে মাঝে। একটি ভিজিডি কার্ডের জন্য মেম্বার চেয়ারম্যানের কাছে অনেকবার গিয়েছি, কান্নাকাটি করেছি। তারা দেবে বলেও, দিল না। হয়ত গরিব মানুষ টাকা দিতে পারিনি বলে দেইনি।

একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা দুস্থ হতদরিদ্র হাজরা খাতুনের অভিযোগ, অসুস্থ স্বামী ও শিশু সন্তান নিয়ে অন্যের জায়গায় ঝুপড়ি বেঁধে কখনো খেয়ে, না খেয়ে কোন রকম বেঁচে আছি। চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে অনেকবার গিয়েছি বসবাসের জন্য একটি ঘরের জন্য, একটু দিনমজুরের কাজের জন্য, কোন তালিকায় নাম তুলতে পারিনি। তারা বলেছিল একটা ভিজিডি কার্ড করে দেবে। সেই আশায় অনলাইনে নাম তুলেছিলাম, অনেক আশা করেছিলাম, এবার হয়তো বাদ যাব না। কিন্তু হলো না। আশায় রাখার কী দরকার ছিল।

এমন অভিযোগ স্বামী পরিত্যাক্তা শরিফা খাতুনের। তার বৃদ্ধ মাতা হালিমা বেগম বলেন, ঘরে তিনটা স্বামী পরিত্যাক্তা মেয়ে। স্বামী বৃদ্ধ চলতে পারে না। দুবেলা দুমুঠো ভাত ঠিকমত জোগাড় করতে পারি না। অনেক হাটাহাটি করেছি তবুও তালিকায় নাম ওঠেনি।
কার্ড পাওয়া স্বচ্ছল এক ব্যবসায়ী পরিবারের সাথে কথা হয়- আপনি স্বচ্ছল ব্যবসায়ী মানুষ। আপনার স্ত্রী কিভাবে কার্ড পেলো? উত্তরে তিনি বলেন, ভোটের আগে মহিলা মেম্বর কথা দিছিলেন একটা কার্ড দেবেন তাই দিছে। টাকা দিয়ে কার্ড পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে? তিনি হেসে কথা ঘুরিয়ে দেন।

সদর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা স্বামী পরিত্যাক্তা মমতাজের অভিযোগ মেম্বার ও স্থানীয় গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মিলে টাকার বিনিময়ে তাদের নিজেদের লোকজনদের নাম তুলেছে। তালিকায় চৌকিদারের আপন ভাবী, আপন শালিসহ তার অন্তত ৫/৭ জন আত্মীয়ের নাম তুলেছে। তারা সবাই এই গ্রামের স্বচ্ছল লোক। তাদের ধানের জমি ও ঘের আছে। চৌকিদার আমার কাছে টাকা চেয়েছিল আমি টাকা দিতে পারিনি।

তবে গ্রাম পুলিশ আব্দুর রাজ্জাক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার আত্মীয়-স্বজনের নাম থাকলেও তারা প্রকৃতপক্ষে দুস্থ। সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আখতারুজ্জামান টাকা চাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তালিকায় আমার দেওয়া নাম গুলো সঠিক, সচ্ছল ব্যক্তির নাম চেয়ারম্যান ও মহিলা মেম্বার দিয়েছে।

কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এইচ এম হুমায়ুন কবির বলেন, তালিকা ইউপি সদস্যদস্যরা দিয়েছে অনিয়ম হলে খতিয়ে দেখা হবে।

উপজেলা ভিজিডি কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রেশমা আক্তার বলেন, এ ব্যাপারে একাধিক লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি উপজেলা ভিজিডি কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় আশ্বস্থ করেছেন, অনিয়ম প্রমাণিত হলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, বিষয়টি শুনেছি কয়েকটি স্বচ্ছল পরিবারের নাম আসছে। তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহর করা হবে। গরীরের কার্ড গরীবরাই শতভাগ পাবে।

এ ব্যাপারে ১০৪, খুলনা ৬ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, দুস্থ অসহায় জনগণের ভিজিডি চাল নিয়ে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরকে ভিজিডি চালের কার্ড প্রকৃত অসহায় এবং দুস্থদের মাঝে বিতরণের আহবানও করেছেন।