আজিজুর রহমান, কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি: সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে/ সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে’। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদেশের মাটিতে বসে তার শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদকে নিয়ে এই কবিতাটি লিখেছিলেন। কবির জন্ম স্থান যশোরের সাগরদাঁড়ি। যার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে এই কপোতাক্ষ নদ। কবির শৈশবের স্মৃতি মাখা সাগরদাঁড়ি গ্রামের পৈত্রিক বাড়িতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন এই ঈদের ছুটিতে।
এখানে কবির বাড়িকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে মধুপল্লী। অপরূপ গ্রামীণ পরিবেশে কবির স্মৃতিকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ি হতে পারে আপনার জন্য দারুণ এক বেড়ানোর জায়গা। যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ছায়া সুনিবিড় সাগরদাঁড়ি গ্রামে কপোতাক্ষ নদের কোল ঘেঁষে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই বাড়িটি। যশোর শহর থেকে এর দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। কবির জীবনের নানা অধ্যায়ের স্মৃতির জাল দিয়ে ঘেরা এই বাড়িটি আপনাকে নিয়ে যাবে বাংলা কবিতার এই প্রবাদ পুরুষের সৃষ্টিশীলতার আরো কাছে। সাগরদাঁড়ি যাবার পথটি অত্যন্ত উপভোগ্য। আঁকাবাঁকা পথ আর দুই ধারে সবুজ ধানক্ষেত। কোথাও পথের ধারে দেখবেন বাবলার সারি। খেজুর গাছের চমৎকার সমারোহ দেখতে দেখতে কখন যে সাগরদাঁড়ি পৌঁছে যাবেন টেরই পাবেন না।
কবির বাড়িতে প্রবেশ করতেই আপনার চোখে পড়বে কবির আবক্ষ মূর্তি। বাড়ির মধ্যে হালকা হলুদ ও সাদা রঙের দুটি ভবন রয়েছে। মূল বাড়ি সংস্কার করে এ রূপ দেওয়া হয়েছে। বাড়ির উঠানে জমিদার বাড়ির ঠাকুরঘর। বাড়িতে প্রবেশ করার পর দেখতে পাবেন লম্বা ধাঁচের একটি সুদৃশ্য পুকুর। পুকুরের কিনারজুড়ে দেখা যাবে কবির একটি কবিতার পংক্তিমালা—‘দাঁড়াও, পথিক বর জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল!’ বেশ বড় ও পুরনো কিছু আমগাছ রয়েছে পুকুরের চারপাশে।
পুকুর পাড়ের শানবাঁধানো ঘাটে আমগাছের ছায়ায় কিছুটা সময় বসে দেহ জুড়িয়ে নিতে পারবেন। পুকুরের পাড় ঘেঁষে নানা গুল্ম ও পাতাবাহার ফুলের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। বাড়ীটির চারপাশে রয়েছে অসংখ্য বনজ বৃক্ষ। একান্ত নিরিবিলি ছায়াময় এ পরিবেশে পাখির কলকাকলিতে মন কখন যে হারিয়ে যাবে তা বুঝতে পারবেন না। স্নিগ্ধ এক প্রশান্তিতে ভরে উঠবে আপনার মন-প্রাণ। কবির বাড়ির দুটি ভবনের মধ্যে দেখতে পাবেন কবির ও তাঁর পরিবারের ব্যবহৃত সামগ্রী। যা মূলত মধুসূদন মিউজিয়াম। এখানে রয়েছে দা, আলনা, খাট, থালা, কাঠের সিন্দুক, কবির লিখিত পাণ্ডুলিপি, পারিবারিক ছবি, কবির বন্ধুদের ছবিসহ নানা কিছু। এর পাশেই দেখতে পাবেন ছোট একটি পাঠাগার। কবির বাড়ি থেকে একটু দূরেই রয়েছে সেই কপোতাক্ষ নদ।
আগের সেই বহমান স্রোত ধারা না থাকলেও এর দুপাশের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। পুরো বাড়িটি দেখা শেষ করে চলে যেতে পারেন জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর সামনে। যেখানে রয়েছে কবির স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক বাদাম গাছ। এর নিচে বসে তিনি কবিতা লিখতেন। এর পিছনে রয়েছে বিদায় ঘাট। কপোতাক্ষ নদের তীরের যে স্থানটিতে কবি শেষবার এসেছিলেন সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতি ফলক। এই ফলকে খুদিত রয়েছে মহাকবির রচিত ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতাটি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলকাতা থেকে স্ত্রী হেনরিয়েটা, সন্তান মেঘনাদ মিল্টন ও শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন।
কিন্তু জমিদার বাবা তাকে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দেননি। অনেকেই বলেন, ১৮৬২ সালে কবি শেষবারের মতো সপরিবারে বজরায় চেপে সাগরদাঁড়িতে এসেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার কারণে তিনি বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেন নি। শেষে এই কাঠবাদাম গাছতলায় তাঁবু খাটিয়ে চৌদ্দ দিন থেকে অবশেষে বিদায় নিয়েছিলেন। তাই এই ঘাটটির নাম হয়েছে বিদায় ঘাট। এই বিদায় ঘাটের এখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মধুসূদন একাডেমী। যার দেয়ালে স্থাপিত হয়েছে কবির লেখা কবিতা এবং ছবি। এখানে কবির সাহিত্যকর্ম, জীবনীসহ নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। প্রতি বছর জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সাগরদাঁড়িতে কবির জন্মোৎসব ও মধুমেলা বসে বলে চাইলে যেতে পারেন সে সময়টাতেও। এই আয়োজনটি চলে পুরো সপ্তাহব্যাপী।
মধুপল্লী এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর— প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং অক্টোবর থেকে মার্চ— প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মধুপল্লীর সাপ্তাহিক ছুটি রোববার। এছাড়া অন্যান্য সরকারী ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। যেভাবে যাবেন: ঢাকার গাবতলি, কল্যাণপুর, কলাবাগান থেকে গ্রিন লাইন পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, ঈগল পরিবহন, শ্যামলী পরিবহনের এসি বাস যশোরের উদ্দেশ্য ঢাকা ছেড়ে যায়।। ভাড়া পড়বে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এ ছাড়া হানিফ, শ্যামলী, সোহাগ, ঈগল ইত্যাদি পরিবহনের নন-এসি বাসও যশোর যায়। ভাড়া পড়বে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।
এছাড়া ঢাকার কমলাপুর থেকে সপ্তাহের শনিবার ছাড়া প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস এবং সোমবার ছাড়া প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেন চিত্রা এক্সপ্রেস যশোরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। যশোর শহর থেকে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে কেশবপুর উপজেলা সদরে। দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। বাস টার্মিনাল থেকে বাসে করে যেতে পারবেন। ভাড়া পড়বে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।
এরপর সেখান থেকে সিএনজি বা মাইক্রোবাসে করে যেতে হবে সাগরদাঁড়ি। কোথায় থাকবেন: যশোর শহরে অনেক আবাসিক হোটেল আছে। এছাড়া আছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের রেস্টহাউস। সেখানে থাকতে পারেন অথবা কেশবপুর উপজেলা ডাকবাংলোতেও থাকতে পারেন। এছাড়া সাগরদাঁড়িতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের একটি মোটেল আছে। চাইলে সেখানেও থাকতে পারেন।



