২৬ মার্চ আমাদের অনুপ্রেরণা যোগাবে যুগ যুগ ধরে

মো. জাবের হোসেন: স্বাধীনতার ৪৮ তম বছর আজ। একাত্তরের আজকের এই দিনে আমরা বাঙালি জাতি হিসাবে পৃথিবীর বুকে মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছিলাম। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম সেই সব বীরদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

প্রতিবছর র্মাচ মাস আসলইে আমার মনে পড়ে যায়, ১৯৭১ সালরে সইে অগ্নিঝরা মার্চের কথা আর আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার কথা।

তারা দেশের জন্য জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলো বাঙালিরা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য সবকিছু করতে পারে। স্বাধীনতা অর্জন করা যতটা কঠিন, তার থেকেও বেশি কঠিন সেই অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করা। দেশের সূর্য সন্তানরা জীবন দিয়ে শোষকের নাগপাশ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে প্রমাণ করেছিলো তাদের দেশাত্ববোধ। কিন্তু আমরা সেই অর্জিত স্বাধীনতা কতটা রক্ষা করতে পেরেছি সেটি প্রশ্ন!
নৈসর্গিক রুপ,কল্পচিত্র অর মানুষের বিচিত্র চিন্তা-চেতনা লিপিবদ্ধ করার কাজটি বেশ কঠিন। আর গণিতশাস্ত্র,ব্যকরণ,রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভবত কঠিনতর কাজ। কিন্তু মানুষের হৃদয় যে এক বিশাল ক্যানভাস। এই হৃদয় ,মা-মাটি নিয়েই আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ।

দীর্ঘ নয় মাস রক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা। একটি স্বাধীনত জাতি হিসাবে আত্নপ্রকাশের বর্হিপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে। একে এক পাক হানাদার বাহিনীরা আন্তসমর্পণ করতে থাকে । ধীরে ধীরে স্বাধীনতার একবোরেই চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছায়।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পূর্ব পাকিস্থানি দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ হত্যাযজ্ঞে কতজন বাঙালি নিহত হন তা নির্ধারণে কোনো জরিপ পরিচালিত হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার অব্যবহতি পরের এক হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ ধরা হয়। পাকিস্থান বাহিনী কর্তৃক এই গণহত্যা ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের অন্যতম। এই জঘন্যতম হত্যাকান্ডকে স্বরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর সারাদেশে ২৫ মার্চকে গণহত্যা হিসাবে পালিত হয়।

আজকের দিনটি আমাদের জাতীয় দিবস হিসাবে পালিত হয়। একাত্তরের তৎকালীন ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম শুরু করে। এরপর ২৭ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে। বাংলার আপামর জনগনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন জিয়াউর রহমান।

আমাদের স্বাধীনতার উৎপত্তি মূলত সেই বায়ান্ন ভাষা আন্দোলন থেকে। পৃথিবীর কোনো দেশের নাগরিকেরা ভাষার জন্য নিজেদের জীবন দিতে পারে সেটি বায়ান্নর ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাঙালিরা প্রামাণ করেছিলো। আর সেই থেকে বাঙালির মনে-প্রাণে নিজেদের স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণের নেশা সৃষ্টি হয়।

একটি স্বাধীন দেশ, মায়ের ভাষায় কথা বলা সবই আমরা পেয়েছি। আর তার নেতৃত্বে ছিলেন একজন । যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতা কামী মানুষেরা সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ স্বাধীনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। স্বাধীনতার সর্বশেষ মূহুর্তে মার্চের ৭ তারিখে বঙ্গবন্ধু লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম” । ফলশ্রুতিতে আপামর জনতা স্বাধীনতার নেশায় পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও সংগ্রাম করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

একটি স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে কথা বলা, স্বাধীনভাবে চলাচল করা এর থেকে আর বেশি কি বা চাওয়ার থাকে!
স্বাধীনতার ঘোষণা আসে শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের কিছু আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। যেটি পরে চট্টগ্রামে ইপিআরে ট্রান্সমিটারে করে প্রচারের জন্য পাঠানো হয়।

তার ঘোষনাটি ছিল, – “এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই,আপনারা যেখানেই থাকুন,আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যহত থাকুক।”

এরপর ২৬ শে মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাশেম সহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে কয়েকজন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা এম.এ.হান্নান প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণা পত্রটি সর্বপ্রথম মাইকিং করে প্রচার দেন। পরে ২৭ মার্চ পাকিস্থান সেনাবাহিনীর অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষনা করেন।

ঘোষনাপত্রটির ভাষ্য নিম্নরুপ,- “আমি মেজর জিয়া,বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির প্রাদেশিক কমান্ডার ইন চিফ,শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।
আমি আরো ঘোষণা করছি যে, আমরা শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে একটি সাবভৌম ও আইনসিদ্ধ সরকার গঠন করেছি যা আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সরকার জোট নিরপেক্ষ নীতি মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। এ রাষ্ট্র সকল জাতির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক বজায় রাখবে এবং বিশ্বশান্তির জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। আমি সকল দেশের সরকারকে তাদের নিজ নিজ দেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার একটি সার্বভৌম ও আইনসম্মত সরকার এবং বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাবার দাবিদার।”

এর মধ্যে কিছু অসম্পন্ন কথা থেকে যায়, আমাদের দেশীয় মীরজাফর রাজাকার বাহিনী একই জঘন্য ছিলো যে ওদের স্বার্থের জন্য ওরা নিজেদের ঘনিষ্ঠ নিকটতম আত্ননীয়-স্বজনদের ওপর আঘাত করতেও দ্বিধা বোধ করতো না। সে সময় পাক-হানাদার বাহিনীর অত্যাচার যেমন ছিলো,তার চেয়ে বেশি ছিল আমাদের দেশে গড়ে ওঠা পাকিস্থানি দোসর,রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার।

রাজাকার হলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত একটি আধাসামরিক বাহিনী। এটি বাংলাদেশ বিরোধী বাঙালি এবং উর্দুভাষাী অবাঙালি অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত হয়। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে স্বাধীনতার জন্যে লড়াইরত মুক্তি বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য ১৯৭১ সালরে মে মাসে খুলনায় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠতি হয়। খানজাহান আলী রোডে একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন জামায়াতে ইসলামী কর্মী সমন্বয়ে জামায়াতে ইসলামীর র্পূব পাকিস্তান শাখার সহকারী আমীর মাওলানা এ কে এম ইউসুফ প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। আরবী শব্দ রিদাকার থেকে মূলত শব্দটির উৎপত্তি। এর আভিধানিক অর্থ স্বেচ্ছাসেবক। বর্তমানে বাংলা ভাষায় বিশ্বাস ঘাতক বা মীর জাফরের প্রতিশব্দ হিসাবে রাজাকার শব্দটি প্রচলতি। ইতিমধ্যে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে কয়েকজনের ফাঁসিও হয়ছে, যা দেশের সব মানুষরেই জানা।

এসব দেশীয় মীরজাফর রাজাকার বাহিনী গঠন হওয়ার আগে থেকেই পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য মুক্তিবাহিনী তৈরি হয়ে গিয়েছিলো, যা এখন ইতিহাস ঘেঁটেই জানা যায়। মুক্তিবাহিনী হলো ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া বাঙালি সোনা, ছাত্র ও সাধারণ জনতার সমন্বয়ে গঠিত একটি সামরিক বাহিনী। ২৬শে র্মাচ বাংলাদশেরে স্বাধীনতা ঘোষণার পর ধীরে ধীরে সাধারণ বাঙ্গালীদের এই বাহিনী গড়ে উঠে। পরর্বতীতে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ব পাকিস্থান সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যরা বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী” গঠন করেন এবং জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী সর্বাধিনায়ক পদ গ্রহণ করনে। এই সময় ভারত আমাদরে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেন। সাধারণ জনতা যুদ্ধকালীন সময়ে নীরলসভাবে এই বাহিনীকে সাহায্য করে যায়। যুদ্ধের পর পশ্চিম পাকিস্থানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বাংলাদেশের সকল সেনা ও জনতার বাহিনীকে মুক্তিবাহিনী” হিসাবে সম্বোধন করা হয়। মুক্তিবাহিনী বেশিরভাগ সময়ই গেরিলা যুদ্ধের নীতি অবলম্বন করে শত্রু পক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখতো। মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধকৌশল অনেকটা বিপ্লবী চে গুয়েভারার দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলো বলে মনে করা হয় এবং একে বিভিন্ন সময় ফারসি মার্কিনী বাহিনী, ভিযেত কং এবং মার্শাল টিটোর গেরিলা বাহিনীর তুলনা করা হতো এর রণকৌশল ও কার্যকারিতার কারণ।

এরপর থেকে অনেক চড়ায়-উৎতরায় পার করে বাংলাদেশ আজ প্রায় অর্ধশতাব্ধি পার করতে চলেছে। সেই মুক্তিযুদ্ধ থেকে আমরা আমাদের সব অনুপ্রেরণা পায়। মুক্তিযুদ্ধের অসস্প্রদায়িকতা মুক্ত একটি রাষ্ট্র গঠনে কাজ করে চলেছে এদেশের উন্নতীকামী মানুষেরা। যুগ যুগ ধরে মুক্তিযুদ্ধ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যাবে আমাদের এই সোনার বাংলা।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক ,লাল সবুজের কথা

error: লাল সবুজের কথা !!