লাইলাতুলকদর

452

মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী ।। শ্ববে কদ্বর বা লাইলাতুলকদর : এটি একটি পরিভাষা৷ যেটি আমাদের দেশ সহ ভারতীয় উপমহাদেশের বহুল পরিচিত ইসলামি পরিভাষা গুলোর মধ্য অন্যতম৷ আসলে এটি আরবি ও ফারসি মিশ্রিত একটি পরিভাষা ৷ এর মধ্যে শ্বব শব্দের আরবি হচ্ছে (ليلة)যার বাংলা অর্থ রাত ৷ আর ক্বদর শব্দটি আরবি যার বাংলা দুটি অর্থ হতে পারে, একটি হচ্ছে ভাগ্য, অন্যটি সম্মানিত বা মহিমান্বিত৷তাহলে একত্রে শবে/লাইলাতুল ক্বদর এর অর্থ হচ্ছে ভাগ্য রজনী বা মহিমান্বিত রজনী।

আমরা দেখেছি শব/ লাইলাতুল কদ্বরের দুটি অর্থঃ

১,ভাগ্য রজনীঃ যেহেতু এরাতে পরবর্তি একবছরের ভাগ্যলিপি লাওহে মাহফুজ থেকে নিদিষ্ট ফেরেশতাদের নিকট হস্তান্তর করা হয় সেহেতু এটি ভাগ্য রজনী,যেমনটি আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরানুল কারিমের সূরা আদ দুখানের ৪নং আয়াতে বলেছেন فيها يفرق كل امر حكيم অর্থঃ সে রাতে পত্যেক চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থীর কৃত হয়৷ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন, এটি কুরআন নজিলের রাত অর্থাৎ কদরের রাতে সৃষ্টি সম্পর্কিত সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা স্থীর করা হয় যা পরবর্তি শবে- ক্দর পর্যন্ত একবছরে সংঘটিত হবে৷মাহদভী বলেন স্থীর করার অর্থ এ বিষয় গুলো নির্দ্রিষ্ট ফেরেশতাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়৷(তাফসির আবু বকর জাকারিয়)

২, মহিমান্বিত রজনীঃ

আবার যেহেতু এটি মহিমাপূর্ণ একটি রজনী যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা আদ দুখানের ৩ নং আয়াতে এটিকে মুবারকময় রাত বলে অবিহিত করেছেন আবার সূরা আল ক্বদর এর ৩ নং আয়াতে এ রাত্রি কে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলেছেন তাই এটিকে মহিমান্বিত রজনীও বলা হয়৷ বস্তুত দুটি অর্থের মধ্যে কোন বিরোধ নেই৷

এরাতের সুন্নাত নামঃ আল-কুরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ তায়াল ও হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাত কে লাইলাতুল ক্বদর(ليلة القدر) বলে অবিহিত করেছেন তাই এ রাতের সুন্নাত নাম হচ্ছে লাইলাতুল ক্বদর৷ তবে শবে ক্বদর বলাটাও জায়েজ৷ আমাদের উচিৎ সুন্নাত নাম অর্থাৎ লাইলাতুল ক্বদর বলা৷

এ রাতের ফজিলতঃ এরাত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনুল করিম ও সহীহ হদিসে নিন্মোক্ত ফজিলত সমূহ বর্নিত হয়েছেঃ

১, এটি একটি বরকতময় রজনী৷ যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চয় আমি এ কুরআন কে এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি(সূরা আদ-দুখান,৩)

২,এ রাতটি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম৷ যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, অর্থ ক্বদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম৷(সূরা আল ক্বদর, ,৩ )

৩, এ রাতে ঈমান ও ইহতেসাব অর্থাৎ সাওয়াবের আশায় রাত জেগে দাড়িয়ে সালাত আদায় কারিকে তার পূর্ববর্তি গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়৷ যেমন হাদিসে এসেছে

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় সাওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল ক্বদ্‌রে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১৪

৪, এরাতে পত্যেক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থীরকৃত হয়৷ অর্থাৎ নির্দ্রিষ্ট ফেরেশতাদের কাছে ভাগ্যলিপি লাওহে মহফুজ থেকে হস্তান্তর করা হয়৷

ফজিলতের কারনঃ এ রাত এবং এ মাসের ফজিলতের যে কারন জানা যায় তা হচ্ছে আল কুরআন ৷আল কুরআন নাযিল হওয়ার কারনেই এরাত এবং এমাসের মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়েছে যেটা আমরা সূরা আল-ক্বদর ও সূরা আল-বাকারা থেকে জানতে পারি

আমাদের উচিৎ এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা ও বুঝে পড়ার চেষ্টা করা

লাইলাতুল ক্বদর কোন মাসে কোন দিনে সংঘটিত হয়ঃএ বিষয়ে আমরা দেখব কুরআনুল কারিম কি বলে, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারিমে বলেন,অর্থ কুরআনুল কারিম কে রমজান মাসে নাযিল করা হয়েছে৷(সূরা আল-বাকারা:১৮৫) আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন, নিশ্চয় আমি কুরআন কে ক্বদরের রাতে নাযিল করেছে (সূরা আল-ঁক্বদর১)

উপরিউক্ত আয়াত দুটি থেকে আমরা জানতে পারলাম কুরআনুল কারিম রমজান মাসে নাযিল হয়েছে আবার ক্বদরের রাতেও নাযিল হয়েছে এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে লাইলাতুল কদর রমজান মাসেই সংঘটিত হয়েছে যেটে রাসূল( স) এর কথা থেকে আরো স্পষ্ট হয়

রাসূল (স) বলেছেন তোমরা রমজানের শেষ দশকে বিশেষ করে শেষ দশকের বিজোড় রাত গুলোতে তোমরা লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর৷ যেমন হাদিসে এসেছে,

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল ক্বদ্‌রের অনুসন্ধান কর।

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১৭

এ হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, শবে ক্বদর শুধু রমজান মাসেই নয় রমজানের শেষ দশকেও বটে৷ আর এ ব্যাপারে ফকিহ গণ একমত৷ তবে রমজানের শেষ দশকের কোন তারিখে এটি সংঘটিত হয় এ নিয়ে ফকিহ গণের মধ্যে মতভেদ হয়েছে৷ কেউ ২৩,কেউ২৫,কেউ ২৭,আবার কেউ ২৯ আর এ ব্যাপারে অনেক মতভেদ হয়েছে৷ আমরা লাইলাতুল ক্বদরের তারিখ নির্ধারনের আলোচনার পূর্বে আমরা একটি হাদিস দেখে নেব তারপর আমরা আলোচনায় যাব হাদিসটি হচ্ছে,,

আবূ সা’ঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:তিনি বলেন, আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) – এর সঙ্গে রমযানের মধ্যম দশকে ই’তিকাফ করি। তিনি বিশ তারিখের সকালে বের হয়ে আমাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ আমাকে লাইলাতুল কদর (-এর সঠিক তারিখ) দেখানো হয়েছিল পরে আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতে তার সন্ধান কর।সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২০১৬

উপরোক্ত হাদিসটি থেকে আমরা জানতে পারলাম যে লাইলাতুল ক্বদরের নির্দ্রিষ্ট তারিখ রাসূলুল্লাহ (স) কে জানানো হয়েছিল এবং রাসূল (স) তার উম্মতকেও জানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু তাঁকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ৷ তাই রাসূল (স) তার উম্মতদের কে রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধানের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যান রয়েছ ৷ কিন্তু কিছু হাদিসে এ বিষয়ে নির্দ্রিষ্ট তারিখ নির্ধারন করা হয়েছে আমরা প্রথম এ বিষয়ের হাদিস গুলো দেখবো পরে সমাধানে পৌছানোর চেষ্টা করবো ইনশা আল্লাহ৷ এ বিষয়ের হাদিস গুলো হচ্ছে,

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমরা রমাযানের শেষ দশকে ‘লাইলাতুল ক্বদর’ অন্বেষণ করো। রমাযানের নয় দিন বাকী থাকতে, সাত দিন বাকী থাকতে এবং পাঁচদিন বাকী থাকতে।সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৩৮১

মু’আবিয়াহ ইবনু আবূ সুফিয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে বলেছেনঃ লাইলাতুল ক্বদর সাতাইশের রাতে।

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৩৮৬

এ সম্পর্কিত হাদিস সমূহ থেকে আমরা জানেছি যে, লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন হাদিসে ভিন্ন ভিন্ন দিন নির্ধারন করা হয়েছে৷ যেমন 21,23,25,27, এর রাত ৷ তাহলে এর সমাধান কি হবে? আমরা যদি একটু খেয়াল করি তাহলে খুব সহজেই এর সমাধান বের করতে পারবো৷

১,উপরোক্ত হাদিস সমূহে যে তারিখ গুলো নির্ধারন করা হয়েছ সে গুলো মিলালে আমরা দেখতে পাই যে এ রাত গুলা হচ্ছে রমজানের শেষ দশকের বিজড় রাত৷

২, এ হাদিস সমূহ থেকে এটি ও প্রতিয়মান হয় যে, প্রতি বছর একই রাতে লাইলাতুল ক্বদর সংঘটিত হয় না ৷ অতএব আমাদের কোন একটি সু নির্দ্রিষ্ট তারিখের উপর নির্ভরশীল না হয়ে রমজানের শেষ দশকের সকল বিজড় রাতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করা উচিৎ

৩,আমাদের উচিৎ রাসূল (স) এর ঐ কথার দিকে ফিরে যাওয়া যে তোমরা

রমজানের শেষ দশকের বিজড় রাত গুলোতে লাইলাতুল ক্বদর অন্বেষণ কর এবং এতেই তেমাদের জন্য কল্যান রয়েছে

এ রাত চিনার উপায়ঃ

এরাত চিনার কয়েকটি চিহ্ন হাদিসে পাওয়া যায় ৷ যেমন হাদিসে এসেছে,

১, ঐ রাতের ভোরের সূর্য উপরে না ওঠা পর্যন্ত নিস্প্রভ থাকবে, যেন একটি থালার মত৷( আবু দাউদ )

২ এরাত শান্তিময় হওয়া, ( সূরা আল-ক্বদর 5,)

৩,বৃষ্টি হওয়া ( বুখারী ও মুসলিম)

আমাদের করনিয়ঃ

১, কোন একটি সু নির্দ্রিষ্ট রাতের প্রতি নির্ভর্শীল না হয়ে রমজানের শেষ দশকের বিশেষ করে বিজড় রাত গুলোতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করা৷

২,এ রাত গুলোতে বেশি বেশি সালাত আদায় করা যেমন টি হাদিসে এসেছে,

৩, এ বিষয় সম্পর্কিত ঝগড়া পরিহার করা ৷

৪,রমজানের শেষ দশকে নিন্মোক্ত দুয়াটি বেশি বেশি পড়া।

পরিশেষে মহান আল্লহর কাছে দুয়া করি আল্লাহ যেন আমাদেরকে লাইলাতুল ক্বদরের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দেন৷আমিন

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-ফিকহ্ এন্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।