সর্বশেষ সংবাদ

মুখ দিয়ে ছবি এঁকে পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করার স্বপ্নে বিভোর পেইন্টার ইব্রাহীম!

মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ প্রতিনিধিঃ পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার কারনে বিদ্যুতের খুটি থেকে পড়ে হারিয়েছেন দুই হাত আর সাথে পঙ্গু হয়েছে তাঁর দুই পা। ঢাকার সাভারে অবস্থিত সি আর পি তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন মাসের প্রশিক্ষণে ছবি আঁকার প্রতি তাঁর ভালোবাসার জন্ম হয়। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়ির পুকুর পাড়ে বসে মুখের সাহায্যে পেন্সিল ও রঙ তুলি দিয়ে ছবি আঁকেন।

তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনরা তাঁর প্রতিভাকে দেখে মুগ্ধ। তিনি যখন ছবি আঁকেন তখন তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনরা তা মুগ্ধ হয়ে দেখেন। আর তাঁর প্রতিভাকে সম্মান জানান তারা। মুখ দিয়ে ছবি আঁকা যে তাঁর একটি বিশেষ গুন তা তাঁর ছবিগুলোর দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়। তিনি জানেন তাঁর প্রতিভাকে গ্রামে থেকে বিকশিত করা সম্ভব না । তবুও মাঊথ পেইন্টার ইব্রাহীমের স্বপ্ন একদিন তিনি মুখ দিয়ে ছবি এঁকে পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করবেন।

এমদাদুল মল্লিক ইব্রাহিমের দুই হাত নেই। হুইলচেয়ারে বসা দুই পা পুরোপুরি অবশ। তবে ইব্রাহিম মল্লিকের মাথা ও মুখ খুব ব্যস্ত। মুখে তুলি। ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার রং নিচ্ছেন আর ছবি আঁকছেন। হুইলচেয়ারের সঙ্গে বিশেষ উপায়ে লাগানো ক্যানভাসে গরু, গাছ, মানুষসহ বিভিন্ন জিনিসের ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

দূর্ঘটনার পর স্থানীয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে সাভারের সিআরপিতে চিকিৎসা নেন আট বছর। মুখ দিয়ে ছবি আঁকা প্রসঙ্গে এমদাদুল বলেন, সিআরপিতে থাকা অবস্থায় সবার কাছে শুনেছেন লাভলী নামের একজন মুখ দিয়ে ছবি আঁকতেন। লাভলীর সঙ্গে তাঁর কখনো দেখা হয়নি। লাভলীর গল্প শুনেই অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে ছবি আঁকতে বসলে মাথা ঘুরত। বমি করতাম। পরে সব ঠিক হয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছবি আঁকতে পারতেন। বেশি ভালো লাগে প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকতে। তবে বর্তমানে বেশিক্ষন ছবি আঁকতে পারেন না তিনি। একটানা ছবি আঁকলে গায়ে জ্বর আসে। শরীরের সার্বিক পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নেই। গত চার বছর যাবত তিনি তাঁর বৃদ্ধা মায়ের অসুস্থতার কারনে নিজ বাড়ি চককেশব বালুবাজারে আছেন । নিজ বাড়িতে থেকে তাঁর মুখ দিয়ে অকংনকৃত ছবি প্রদর্শনী অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই তিনি যদি সুযোগ পান তবে তাঁর প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে চান।

নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার পরানপুর ইউনিয়নের চককেশব (বালুবাজার) নিজ গ্রামে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে বসবাস করছেন মাউত পেইন্টার (গড়ঁঃয চধরহঃবৎ) এমদাদুল মল্লিক ইব্রাহিম । সরকার কর্তৃক প্রতিবন্ধী ভাতা ও মায়ের বিধবা ভাতা দিয়ে কোন রকমে চলছে তাঁর জীবন সংসার। যদি কখনও সুযোগ হয় তবে তাঁর প্রতিভাকে প্রদর্শনী আকারে তুলে ধরতে দৃঢ় প্রত্যয়ী তিনি। পাশাপাশি ছবি থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে নিজের ও মায়ের দেখাশুনা চালিয়ে যেতে চান তিনি।

এমদাদুল মল্লিক ইব্রাহিম জানান, তার দুই হাত ছিল। পা সচল ছিল। পড়াশোনা করেছেন এইচএসসি পর্যন্ত। কাজ করতেন দিনাজপুর পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান হিসেবে। ২০০৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর সব ওলট পালট হয়ে গেল। লাইনম্যান হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ঘটল দূর্ঘটনা। দূর্ঘটনায় তিনি হারিয়ে ফেলেন তার দু’টি হাত। চিকিৎসার খরচ পল্লী বিদ্যুৎ নিলেও নেয়নি তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের দায়িত্ব। তাই নিজ চেষ্টায় তিনি ছবি আঁকা শিখে নিজের কর্মকে সবার কাছে তুলে ধরেছেন ।

সিআরপিতে থাকা অবস্থায় তাঁর আঁকা ছবি দিয়ে অনেকগুলো প্রদর্শণী করেছেন বলে জানান তিনি। আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় ছিল। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগও ছিল নিয়মিত। তাঁদের মাধ্যমেই তাঁর ছবি আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বিক্রি হয়েছে। ছবির দাম নিয়ে দেনদরবার তেমন একটা করা হয় না। বেশির ভাগ সময়ই একেকজন খুশি হয়ে যা দেন, তা-ই নেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি তাঁর কাছ থেকে ২০টি ছবি নিয়ে এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন, সে কথাও জানালেন।

পরানপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ ইলিয়াস খান জানান, তিনি মাউথ পেইন্টার এমদাদুল মল্লিক ইব্রাহিমকে প্রতিবন্ধী ভাতাভুগী কার্ড এবং তার মায়ের জন্য বিধবা ভাতাভুগী কার্ডের ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, উপজেলা ভিত্তিক ছবি প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা না থাকায় ইব্রাহিমের প্রতিভাকে সে বিকশিত করতে সক্ষম হচ্ছে না । যদি বড় পর্যায়ে কখনো তাঁর প্রতিভাকে দেখানোর সুযোগ পান তবে তিনি একদিন দেশের সম্পদ হয়ে উঠবেন ।

মান্দা উপজেলা প্রকল্প ব্যাস্তবায়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, দুই হাত নেই তবুও তিনি মুখের সাহায্যে এঁকে চলেছেন বিভিন্ন রকমের ছবি। উপজেলা প্রশাসন থেকে তাঁর ছবি প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা করা হবে এবং তাকে সরকার কর্তৃক সার্বিক সহযোগিতা করা হবে ।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম জানান, উপজেলা সমাজসেবা থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হয়েছে তারপরও যদি তাঁর ছবি আঁকাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারী ঋণের মাধ্যমে তাকে সহযোগিতা করা হবে।

error: লাল সবুজের কথা !!