সর্বশেষ সংবাদ

মান্দায় গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার মেলা অনুষ্ঠিত

মাহবুবুজ্জামান সেতু,নওগাঁ প্রতিনিধি: বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা। গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি অংশ লাঠি খেলা। ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি এখনো বেশ জনপ্রিয়। আবহমানকাল ধরে নওগাঁ জেলায় এক সময় বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে লাঠি খেলা।
কিন্তু কালের বিবর্তণে মানুষ আজ ভুলতে বসেছে এই খেলাটি। ঢোল আর লাঠির তালে তালে নাচা নাচি। অন্য দিকে প্রতিপক্ষের হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা সম্বলিত টান টান উত্তেজনার একটি খেলার নাম লাঠি খেলা। লাঠি খেলা অনুশীলনকারীকে লাঠিয়াল বলা হয়। এই খেলার জন্য লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা, তবে প্রায় তৈলাক্ত হয়। প্রত্যেক খেলোয়ার তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করে।

নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার মান্দা ইউ’পির অন্তর্গত শাহাপুর গ্রামের মৃত ওয়েজ মৃধার ছেলে কাজেমের বয়স এখন প্রায় (৪৫) বছর। ছোটবেলা থেকেই তিনি লাঠি খেলতেন। বর্তমানে তিনি অন্যান্য কাজের ফাঁকে তিনি ঢোল বাঁজিয়ে থাকেন। আর প্রায় ৩০ বছর যাবৎ তিনি প্রতি বছরের ন্যায় এই লাঠিখেলার মেলায় ঢোল বাঁজান। তার পিতাই ছিলেন তার লাঠি খেলার ওস্তাদ । এই মেলার আরেকজন ঢুলি ছিলেন মৃত আপালের ছেলে আনিছার রহমান (৪০)। তার বাড়িও একই এলাকায় বলে জানা গেছে।

তাদের পূর্ব পুরুষের কাছ থেকেই মাত্র ১১/১২ বয়সেই এই লাঠি খেলা শিখেছেন। ১২/১৪ বছর আগেই তাদের সাথে আগে লাঠি খেলাগুলো জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে খেলে থাকতেন। কোন মাঠে খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা শুনলে আশেপাশের গ্রামের শতশত মানুষ আসতো।

এ কসময় দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খারাপ থাকার কারণে এই খেলাগুলো মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত হয়ে যান খেলোয়াররা । শাহাপুর ঢোলপুকুরিয়া গ্রামের লাঠিয়াল মমতাজ (৫৫) এবং কয়াপাড়া গ্রামের লাঠিয়াল বেলাল হোসেন (৩৫) জানান, প্রতিবছর এ দিনে আমরা লাঠি খেলে থাকি।

উল্লেখ্য, এই এলাকার মানুষদের সংস্কৃতি এটি। অত্র এলাকার মানুষ ভিন্নধর্মী আনন্দ বিনোদন পেতে এই গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলার আয়োজন করে থাকে। এ উপলক্ষে শাহাপুকুরিয়া ডিএ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একদিনের লাঠিখেলার মেলা বসে।মেলায় বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত শিশু,কিশোর,কিশোরী, নারী,পুরুষ, আবাল,বৃদ্ধ, বনিতারা সমবেত হয়ে থাকেন। মেলা উপলক্ষে অত্র এলাকার জামাই-মেয়েসহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করে থাকেন। এ মেলার প্রধান আকর্ষনীয় খাবার হচ্ছে, জিলাপি, ভুট্টা,বিন্নিধান এবং শাপলা/ভ্যাটের খই, মুড়ি,মুরকি, মতিচুরের নাড়ু,কদমা, চিনির গয়রা,বাদসা, জাম,বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি ইত্যাদি। এছাড়াও শাহাপুর ঢোলপুকুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ এবং সাহাপুর ডিএ উচ্চ বিদ্যালয়ের যৌথ মাঠে তেঁতুল গাছের নিচে শতাধিক দোকান বসে। এদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র,কসমেটিক্স, ফাস্টফুড, মিষ্টি,চানাচুর ভাজা, ভুট্টার খৈইয়ের দোকান ছিলো উল্লেখযোগ্য।

মেলায় আগত দর্শক মান্দার মৈনম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদ, রনি এন্টার প্রাইজের মালিক বড়পই গ্রামের রাইহানুল ইসলাম রনি, খাঁন কম্পিউটারের সাদ্দাম হোসেন, ফেরিঘাট এম আর কম্পিউটারের মালিক আবু রায়হানের একান্ত আস্থাভাজন সুজন খাঁন, আশ্রয় অফিসে কর্মরত সাপাহারের রাফিউল, শশুর বাড়িতে বেড়াতে আসা ঢাকার আকরাম,শাহাপুর গ্রামের আলমগীর হোসেনসহ আরো অনেকে জানান, এ মেলায় এসে আমাদের অনেক ভালো লেগেছে। কেউ বলেছে যে এই প্রথম এসেছি এই মেলায়। আবার কেউবা বলেছেন ,এই মেলায় আমি অনেক আগে থেকেই আসি। বেশ ভালোই লাগে। একসময় অনেক লোক সমাগম হতো।কিন্তু এখন আর তেমন লোক সমাগম হয় না। তবে একেবারেই যে কম তা কিন্তু না।

খেলাটি অত্র এলাকায় এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। অনেকে অাবার অপছন্দ করে। আজ থেকে গত কয়েক বছর আগে এ এলাকায় মেলার প্রায় এক সপ্তাহ পূর্ব থেকেই প্রতিটি গ্রামে গ্রামে পাড়া মহল্লায় এ লাঠিখেলা হতো। লাঠি খেলা আর ঢোলের শব্দে কেউ পাশে থেকে কাউকে ডাকলেও শোনা যেতো না। পবিত্র আশুরার দিনে খেলাটি যদিওবা বেমানান, তবুও এই এলাকার মানুষরা এই সংস্কৃতিতে আশক্ত।এ অাশুরা উপলক্ষে আড়াই দিনের জন্য কাশিদ বের হয়ে না খেয়ে এজিদের ঘোড়ার মতো দৌড়াইতে থাকে। অবশেষে মঞ্জিলের দিনে কখনো গয়রা খেলা,কখনো সখিনার জারি গেয়ে, আবার কখনওবা লাঠিখেলার আয়োজনসহ স্কুল মাঠের ভিতর তেঁতুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বা বসে গাছটিকে দরগাগতলী বা মাদারের গাছ মনে করে কাশিদরা তাদের আনুষ্ঠিকতার পরিসমাপ্তি ঘটান।

কয়াপাড়া কামাড়কুড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাহারুল ইসলাম জানান, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ লাঠি খেলা আজ বিলুপ্ত প্রায়। আমাদের অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের লাঠিখেলা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম সড়কি খেলা, ফড়ে খেলা, ডাকাত খেলা, বানুটি খেলা, গ্রুপ যুদ্ধ, নরি বারী খেলা দা খেলা এবং ঢেঁকি খেলা ইত্যাদি।

গ্রামের সাধারণ মানুষেরা তাদের নৈমিত্তিক জীবনের উৎসব-বাংলা বর্ষবরণ, বিবাহ, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি উপলক্ষে লাঠি খেলার আয়োজন করে থাকেন। এক্ষেত্রে সাধারণত কোনও লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়।

বিগত দশকেও গ্রামাঞ্চলের লাঠি খেলা বেশ আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে। সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিল এ খেলাটি।
দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত এই খেলা দেখার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মধ্যে এই খেলা দেখা গেলেও তা খুবই সীমিত।এ খেলাটি দিন দিন বিলুপ্তি হওয়ার কারণে এর খেলোয়ার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না কোন নতুন খেলোয়ার।

শাহাপুর ডিএ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, বর্তমান সরকারের কিছু নজর থাকায় জেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট হলেও এই খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার এ খেলাগুলো চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত)এস এম হাবিবুল হাসান জানান, দেশীয় সংস্কৃতি ধরে রাখতে বর্তমান সরকার বেশ আন্তরিক। তবে শুধু সরকার নয় সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা এবং তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।

error: লাল সবুজের কথা !!