একটা ঈদ আনন্দের পরিবর্তে কান্না বয়ে আনতে পারে!

129
মোঃ জাবের হোসেন। ছবি- ফাইল ফটো

মো. জাবের হোসেন ।। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। ধর্মপ্রাণ মুসলিম জাতির জন্য ঈদুল ফিতর একটি বড় পাওয়া। আমরা সাধারণত ঈদ মোবারক শব্দটি ব্যবহার করে থাকি এদিন একে অপরের সাথে। ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ বা উদযাপন আর মোবারক শব্দের অর্থ কল্যাণময়। সুতরাং ঈদ মোবারকের অর্থ হল ঈদ বা আনন্দ উদযাপন কল্যাণময় হোক। কিছু রাষ্ট্রে এই শুভেচ্ছা বিনিময় একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এটি কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার অংশ নয়।

এসময় মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে থাকেন। যারা পরিবারের বাইরে থেকে চাকরি, ব্যবসা অথবা লেখাপড়া সহ বিভিন্ন কাজ করে থাকেন তারা শুধুমাত্র পরিবারের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য কষ্ট করে হলেও ছুঁটে চলে যান পরিবারের কাছে।

বর্তমান বিশ্ব এক মহা সমস্যার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এক অদৃশ্য শক্তি কোভিভ-১৯ (করোনা ভাইরাস)-এর আর্বিভাবে সারা বিশ্ব আজ পর্যুদস্ত। কি ধনী কি গরিব কেউই রেহায় পাচ্ছেনা করোনা ভাইরাসের হাত থেকে। করোনা ভাইরাস মহামারিতে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বের মানুষ আজ এত এত অর্থ আর প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও অসহায়।

মহাগ্রন্থ আল-কোরআন ও হাদিছে উল্লেখ আছে মহামারি পৃথীবিতে আল্লাহর একটি শাস্তি। যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতার মতো জঘন্য পাপ বেড়ে যায়, তখন আল্লাহ তাদের মহামারির মাধ্যমে শাস্তি দেন। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা আগের লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; যার ফলে তাদের কৃতকর্মের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তাদেরকে তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। (সূরা রূম : ৪১)

বেশির ভাগ মহামারি সংক্রামক। তাই মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) মহামারীর সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত অঞ্চলে যাতায়াত নিষিদ্ধ করেছেন। মুমিন ইমান ও ইখলাসের সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করবে। মহামারীর ব্যাপারে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘কোথাও মহামারী দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা ছেড়ে চলে এসো না। আবার কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করে থাকলে, সে জায়গায় গমন করো না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫)

একটি বর্ণনায় দেখা গেছে, সিরিয়ায় মহামারী দেখা দিলে ওমর (রা.) তার গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর স্থগিত করেন। (বোখারি, হাদিস : ৫৭২৯)
তাই যেখানে মহামারীর প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে, সেখানে যাতায়াত উচিত নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র সরকারিভাবে করোনা আক্রান্ত দেশগুলোতে যাতায়াতে সতর্কতা জারি করেছে। চিকিৎসকদের মতে এ ভাইরাসটি একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে ছড়ায়, অন্যজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, হাত মেলানো ও কথাবার্তায় সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

আমি এতক্ষণ ধরে উপরিউক্ত কথাগুলোর বলছিলাম তার একমাত্র কারন হলো যাতে আমরা একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত না করি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন ছাড়া। টিভি, পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি করোনার মরণব্যাধি ঝুঁকি নিয়েও মানুষ শুধু পরিবারের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য কর্মস্থল থেকে গ্রামের দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

নিজ দেশ থেকে যারা কর্ম এবং লেখাপড়ার জন্য বাইরের দেশে যায় তাদেরকে সে দেশে বলে প্রবাসী। আমাদের সোনার বাংলাদেশ থেকে এরকম লক্ষ লক্ষ লোক প্রবাস জীবন যাপন করছেন। রেমিট্যান্স যোদ্ধা তারা আমাদের। তারা নিজ পরিবার পরিজন রেখে বছরের পর বছর প্রবাস জীবনে ঈদ আনন্দ উদযাপন করছেন। কই তাদের মনে তো এত আফসোস নেই যতটা আফসোস দেশের ভিতরে থেকে যারা ঢাকা থেকে গ্রামে যাচ্ছেন মহামারির এ পরিস্থিতির মধ্যে।

একটা বার ভাবুন তো আপনি আজ ঈদ আনন্দ করতে ঢাকা থেকে একপ্রকার যুদ্ধ করে পরিবারের কাছে ছুঁটে যাচ্ছেন। আল্লাহ না করুক কোনো করোনা রোগির সংস্পর্শে আপনি যদি অসুস্থ হয়ে বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকেন তখন কি হবে আপনার পরিবারের? কি হবে আপনার বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তানের? এই করোনা নিয়ে অনেক ভিডিও দেখেছি স্যোস্যাল মিডিয়াতে। করোনায় আক্রান্ত হলে সন্তান যাচ্ছেনা পিতা মাতার কাছে, স্ত্রী যাচ্ছেনা স্বামীর কাছে, কেউ তখন কাছে যায়না। একগ্লাস পানিও দিতে কেউ সাহস পায়না। তখন তো ভালোবাসা পাওয়া যায়না। এই ঈদ আনন্দের ভালোবাসা তখন কোথায় থাকে?

আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের আকাশ-বাতাস কান্নায় ভারি হয়ে গেছে। লাশের সারি। কি হাসপাতাল, কি বাড়ি, কি শ্বশান কোথাও জায়গা নেই লাশের জন্য। ইতিমধ্যে দেখলাম ভারতের করোনার ধরণ আমাদের দেশেও দেখা দিয়েছে।

তাই আমরা যদি এখন’ই সচেতন না হয় তাহলে হয়তো ভারতের মত আমাদের বাংলার আকাশ-বাতাস কান্নায় ভারি হয়ে যাবে। শুধু ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য গ্রামে যাওয়াটা মটেও বাঞ্চনীয় নয়।

ঠিক যতটা উৎফুল্ল মন নিয়ে আজ যারা ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন ঠিক ততটাই বঞ্চনার স্বীকার হতে হবে আক্রান্ত হলে। আল্লাহ হায়াত দান করলে জীবনে অনেক ঈদ আনন্দ পরিবারের সাথে ভাগাভাগি করতে পারবেন। সামান্য একটা বছর না হয় কর্মস্থলেই ঈদটা কাটান। তাতে আপনি ও আপনার পরিবার ভালো থাকবে। আর আপনার পরিবার ভালো থাকলে দেশটাও ভালো থাকবে। তাই আসুন অতি উৎসাহী না হয়ে সচেতন হই। তাতে দেশ ও দশের মঙ্গল হবে।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, লাল সবুজের কথা।