
মো. জাবের হোসেন : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় আম্পান গত বছরের ২০ মে উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানে। সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আশাশুনির প্রতাপনগরের বাসিন্দারা। দীর্ঘ ৯ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো হাজার হাজার মানুষ গৃহবন্দী হয়ে রয়েছে নদীর জোয়ার-ভাটার কারনে।
আশাশুনি উপজেলা সূত্রে জানা গেছে, আশাশুনি উপজেলায় ১১টি ইউনিয়নে ১৪৬ টি গ্রাম রয়েছে যার আয়তন ৩৭৬.৮৫ বর্গ কিলোমিটার। এরমধ্যে গ্রাম অঞ্চল রয়েছে ৩৩৭.৫৫ বর্গ কিলোমিটার এবং চরাঞ্চল রয়েছে ৩৯.৩০ বর্গ কিলোমিটার। এসব এলাকায় মোট জনসংখ্যা রয়েছে ২৮৩০৬৩ জন। তন্মধ্যে নারী ১৩৪৭৬৪ জন ও পুরুষ ১৩৩৯৯০ জন এবং শিশুর সংখ্যা ১৪৩০৯ জন। আবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে নারী ১৮৮২ জন, পুরুষ ২৬৫৫ জন এবং শিশু ২০৭৬ জন মিলে মোট ৪৫৩৭ জন। তবে আম্পানে মোট ক্ষতিগ্রস্ত খানার সংখ্যা ৬১৯৬৪টি।

আশাশুনি উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত জনসংখ্যার মধ্যে স্থানচ্যুত হয়েছে নারী ১৫৮০০ জন, পুরুষ ২৫২০০ জন এবং শিশু ৩১০০ জন। আবার ক্ষতিগ্রস্ত মোট প্রতিবন্ধীর মধ্যে নারী ২২০, পুরুষ ৫১০, শিশু ১০৫ সহ মোট ৮৩৫। ক্ষতিগ্রস্ত মোট খানার মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭৮৫০, আংশিক ১৫৬০০ সহ মোট ২৩৪৫০। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির মধ্যে পাকা বাড়ি ৮৫২টি, আধাপাকা ৩৫৯১টি এবং কাঁচাবাড়ি ৫৭৫২১টি। শস্যক্ষেত ১৬৭১ হেক্টর,বীজতলা ৮৬৭ হেক্টর,হ্যাচারি মৎস্য ও চিংড়িঘের মিলে মোট ১৩৯৯৭ হেক্টর। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত শস্য ক্ষেত ৩২৯ হেক্টর যার গড় মূল্য (হেক্টর প্রতি) ১.১৫ লক্ষ টাকা হিসাবে মোট ৩৭৮.০০ লক্ষ টাকা অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হ্যাচারি,মৎস্য চিংড়িঘের মৎস্য বিচরণ এলাকা, ৮৬৯৮ হেক্টর। হেক্টরপ্রতি গড় মূল্য ৮২৬৩.১০ টাকা হিসাবে মোট মূল্য ৮২৬৩.১০ লক্ষ। সরকারি ২০টি ও বেসরকারি ৯০টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। আশ্রয়যোগ্য নিরাপদ অবকাঠামো রয়েছে ১৮০টি। সরকারি ও বেসরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে দুর্যোগে আক্রান্ত আশ্রয়গ্রহণকারী ব্যক্তির সংখ্যা ৬০০০০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ ৮টি, কালভার্ট ৩৭৩টি। মোট বাঁধ (কিঃমিঃ) হয়েছে ১৬৫.৯৫ কিঃ মিঃ নদী এবং ২৮১ কিঃমিঃ উপকূল। যার মধ্যে প্রতি কিলোমিটারে ক্ষতির পরিমাণ হয়েছে ০০.০৩৯ কিঃ মিঃ (নদী) এবং উপকূলের মধ্যে প্রতি কিঃমিঃ গড় ক্ষতি ২.৭০০ সম্পূর্ণ এবং আংশিক প্রতি কিঃমিঃ ৩২.০০। বনায়ন ৫৩৯ হেক্টর এবং নার্সারী ১ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৪৬৬টি গভীর নলকূপের মধ্যে আংশিক ক্ষতি হয়েছে ২০৫টি, অগভীর ১৬১৩টির মধ্যে ২০৫টি।
মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতাপনগর, শ্রীউলা, আশাশুনি, আনুলিয়া ইউনিয়ের মধ্যে আবার সবথেকে মারাত্নক ক্ষতিগ্রস্ত হলো প্রতাপনগর ইউনিয়ন।
বৃহস্পতিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়ন ঘুরে ঘুরে জানা যায়, এ এলাকার মানুষেরা এখনো আম্পানের তাণ্ডব কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। প্রতাপনগরের উত্তরে আনুলিয়া, পূর্বে কয়রা, দক্ষিণে পদ্মপুকুর এবং পশ্চিমে শ্রীউলা অবস্থিত।
প্রতাপনগরের কুড়িকাহনিয়া গ্রামের নজরুল ফকিরের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৫০) দুঃখ ভারাক্রান্তভাবে বলেন, আমার ২ ছেলে ১ মেয়ে স্বামী একজন দিনমজুর, মাত্র ২০ দিন আগে আমরা বাড়ি ফিরেছি। এতদিন প্রতাপনগর ইউনাইটেড স্কুলের সাইক্লোন শেল্টারে ছিলাম। এখন স্কুল খুলবে বলে আমারা বাড়িতে গিয়েছি তবে জোয়ার-ভাটা এখনো নিয়মিত উঠা-নামা করে যার জন্য বাড়ি থেকে বের হতে এবং যেতে উভয়ই খুব দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জোয়ারের সময় নৌকায় ছাড়া চলাচল করা যায়না, ভাটার সময় কাঁদায় হেঁটে হেঁটে বাড়ি যেতে হয়। নৌকা তো আমাদের নেই তাই বাইরে কোনো প্রয়োজন হলে ভাটার সময় বের হয়ে কাজ মেটাতে হয়। তবে যদি কোনোভাবে দেরি হয়ে যায় আর এরমধ্যে যদি জোয়ার চলে আসে তাহলে ভাটা না পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কাজ কাম কিছু নেই এখন, খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছি। খাবার পানি, টয়লেটের খুব সমস্যা। ভাসমান টয়লেট তৈরি করে নিয়েছি।

প্রতাপনগরের ৩ নং ওয়ার্ডের কুড়িকাহনিয়া গ্রামের মৃত মোহর আলীর ছেলে মুনসুর সানা (৭৪) জানান, স্ত্রী, ৩ ছেলে-বউ নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আর্থিক কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট পানি, টয়লেট, যাতায়াত, বাজার-ঘাট নিয়ে। বর্ষা মৌসুম আসলেই আরো ভোগান্তি বেড়ে যাবে। অপরদিকে প্রতাপনগরের হায়াত আলীর ছেলে জাহিদ হাসান (৩৪) বলেন, আমি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে কম্পিউটারের দোকানে ব্যবসা করি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারনে আজ অবধি আমার ব্যবসা ভালো যাচ্ছেনা। মানুষের চারিদিকে হাহাকার, কীভাবে ব্যবসা ভালো চলবে জানিনা। যাদের ভিটা-বাড়ি পানিতে বিলিন হয়ে গেছে তারা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে এখনো বাড়ি ফিরেনি, আর ফিরবেও কিনা জানিনা।
একই এলাকার মোকছেদ আলীর ছেলে মো. আমিনুর রহমান (৩৫) জানান, আমরা এখন টিকে থাকার তাগিদে ঠেঁলা জাল, নদীতে কাঁকড়া আহরণ, হরিণা মাছ মেরে বাজারে বিক্রি করে দিনাতিপাত করছি। ভাঙ্গনে অনেকের শেষ সম্বলটুকু বিলিন হয়ে গেছে।

প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে আরো জানা গেছে, ইউনিয়নে মোট ৮১১৮টি খানা রয়েছে। শুধু নাকনা গ্রাম ছাড়া ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামে নদীর জোয়ার-ভাটা হয় এখনো। ৪০ হাজার লোকসংখ্যার প্রায় ৩৫ হাজারই এখনো পানিবন্দী জীবনযাপন করছে। তবে এরমধ্যে বেশ কিছু লোকজন স্থানবদল করেছে। বিশেষ করে যাদের পানিতে শেষ সম্বল গৃহ বিলিন হয়ে গেছে তারা আশাশুনি উপজেলা, সাতক্ষীরা অথবা ঢাকায় জীবন বাঁচানোর তাগিদে চলে গেছে। তবে আমরা সে সংখ্যাটি সঠিকভাবে বলতে পারছিনা। প্রতাপনগরের সবথেকে বড় ভাঙ্গন যেটি সেটি হলো লঞ্চঘাট সংলগ্ন গড়ইমহল খাল। এ এলাকার প্রধান পেশা মৎস্য চাষ, তবে পাশাপাশি গবাদী পশু, মুরগি পালন ইত্যাদি। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি হলেই রাস্তার উপর হাঁটু পানি হয়ে যায়।
তবে এখনো প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাইক্লোন শেল্টার, ইউনাইটেড স্কুলের সাইক্লোন শেল্টার, হিজলী কমিউনিটি ক্লিনিক, চাকলা সাইক্লোন শেল্টারে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়ে রয়েছে। চাকলা অবদার পাড়ে এখনো প্রায় ১৫০টি পরিবার বসবাস করছে।
ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে আরো জানা গেছে, প্রত্যেকটা ভাঙ্গনে কাজ চলমান রয়েছে। গত ২ ফেব্রুয়ারি চাকলা ভাঙ্গনে চাঁপ দিয়ে বাঁধার পর সেটি ভেঙ্গে যায়। সর্বশেষ গত ১০ ফেব্রুয়ারি চাঁপ দিয়ে বাঁধা হলেও সেটি বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি প্রবল পানির চাঁপে। বাঁধ কোনোভাবেই স্থায়ী হচ্ছেনা। তবে সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

এ এলাকার মানুষের জীবকায়ন এখন খুব কষ্টের হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। সাতক্ষীরা শহর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রতাপনগর ইউনিয়ন। অপরদিকে আশাশুনি উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইউনিয়নটি অবস্থিত হওয়ায় একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান পরবর্তী সময়ে এ এলাকায় বসবাস করা। তাই যাতে করে আগামী বর্ষা মৌসুম আসার আগে একটা স্থায়ী সমাধান করা যায় সে ব্যাপারে সকলের সুদৃষ্টি কামনা উক্ত অঞ্চলের সকল বসবাসরত মানুষের।


