হঠাৎ আলোচনায় কে এই দেবী শেঠি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জটিল হৃদরোগে আক্রান্ত আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছেন ডা. দেবী শেঠি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আমন্ত্রণেই তিনি বাংলাদেশে এসেছেন বলে জানা গেছে। সেতুমন্ত্রীর চিকিৎসায় পরবর্তী করণীয় কী সে সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করছে উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের ওপর। এ নিয়ে সোমবার সকাল থেকেই সংবাদমাধ্যমে ঘুরে ফিরে বারবার আসছে দেবী শেঠির নাম। কে এই দেবী শেঠি যাকে নিয়ে এত আলোচনা?

পুরো নাম ডা. দেবী প্রসাদ শেঠি। তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র ব্যাঙ্গালুরুর নারায়না ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেসের প্রতিষ্ঠাতা। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডা. শুভ দত্তের পশ্চিমবঙ্গের সিকে বিরলা হাসপাতালের ক্যাথল্যাব প্রধান।

দেবী শেঠি ভারতের কর্নাটক রাজ্যের দক্ষিণ কনাডা জেলার কিন্নিগলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৯ ভাইবোনের মধ্যে অষ্টম দেবী মেডিকেলে পঞ্চম গ্রেডে পড়ার সময় তত্‍কালীন দক্ষিণ আফ্রিকার জনৈক সার্জন কর্তৃক বিশ্বের প্রথম হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের কথা শুনে কার্ডিয়াক সার্জন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

দক্ষিণ ভারতে জন্ম নেয়া দেবী শেঠি ১৯৮২ সালে কস্তুরবা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি বিদ্যায় গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে সার্জারি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ১৯৮৯ সালে লন্ডনের উচ্চাভিলাষী চাকরির লোভ ত্যাগ করে ভারতে ফিরে আসেন। এবং ডা. রায়ের সঙ্গে তিনি কলকাতায় গড়ে তোলেন ভারতের প্রথম হৃদরোগ চিকিৎসা হাসপাতাল বিএম বিরলা হার্ট রিসার্চ সেন্টার।

কিন্তু ভারতীয়দের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ইউরোপিয়ানদের তুলনায় তিনগুণ বেশি হওয়ায় এই একটি হাসপাতাল যথেষ্ট ছিল না। এ জন্য ডা. দেবী শেঠি ও ডা. রায় মিলে আরও তিনটি হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। বিএম বিরলা হার্ট সেন্টার যাত্রা শুরুর অল্পদিনের মধ্যে ভারতের শ্রেষ্ঠ হার্ট হাসপাতালের একটিতে পরিণত হয়।

১৯৯১ সালে ৯ দিন বয়সী শিশু রনির হৃৎপিণ্ড অপারেশন করেন, যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম সফল শিশু হৃৎপিণ্ড অস্ত্রোপচার। তিনি কলকাতায় মাদার তেরেসার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এর কিছুকাল পর তিনি ব্যাঙ্গালুরুতে চলে যান এবং মণিপাল হার্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ১৫ হাজারের বেশি কার্ডিয়াক সার্জারি করেছেন।

ডা. দেবী প্রসাদ শেঠি পৃথিবীর সেরা ১০ চিকিৎসকের একজন, ভারতীয় হিসাবে তিনি ১ নম্বর।

জানা যায়, ডা. দেবী শেঠি একদিন একটি শিশুর জটিল ওপেন হার্ট সার্জারি করছেন এমন সময় তার বিশেষ সহকারী অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করে বলেন- ‘স্যার প্রধানমন্ত্রী ফোন করে লাইনে আছেন এবং আপনার সঙ্গে জরুরি একটা আলাপ আছে বলেছেন’। ডা. শেঠি দেখলেন এই শিশুটির অস্ত্রোপচারে দেরি হলে ক্ষতির সম্ভাবনা, তাই তিনি নিজের সহকারীকে বললেন- ‘পিএম-কে বলো আমি ওটিতে আছি, এক ঘণ্টা পর ফোন করার জন্য’। অবশ্য এক ঘণ্টা পর ঠিকই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন।

ডাঃ দেবী শেঠী নামক এই মহাগুনী ব্যাক্তিটি ১৯৯৭ খ্রীঃ এর এপ্রিল মাস পর্যন্ত চার হাজার শিশুর সফল হার্ট সার্জারী সম্পন্ন করেন। লন্ডনের গাইস হাসপাতলে হার্ট সার্জন হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেয়া ডাঃ দেবী শেঠী কে বন্ধুরা বলতেন `অপারেটিং মেশিন` । বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার স্থাপনের পরই উদ্যেক্তারা শিশুদের জন্য পেডিয়াট্রিক সার্জিক্যালের ব্যবস্থা করেন এবং অল্প দিনের মধ্যে ৭দিন বয়সী এক সদ্যজাত শিশুর সফল অপেন হার্ট সার্জারী সম্পন্ন হয়। ভারতে সে সময় হৃদপিন্ডে সাফল্যজনকভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া শিশুদের মধ্যে তার বয়সই ছিল সবচেয়ে কম।

মাদার তেরেসা তখন ডাঃ দেবী শেঠীর তত্ত্বাবধানে হাসপাতালের ইন-টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ক্রমে ক্রমে সেরে উঠছিলেন। একদিন তিনি দেখেন ডাঃ দেবী শেঠী একটি `ব্লু বেবি` বা নীল শিশুকে বেশ যত্ন করে পরীক্ষা করছেন। বেশ কয়েক মিনিট ধরে চুপচাপ ওই দৃশ্য দেখার পর মাদার তেরেসা ডাঃ শেঠীকে বললেন “আমি এখন বুঝতে পারছি কেন তুমি এখানে আছো। হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের যন্ত্রনা দূর করার জন্যই ঈশ্বর তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।” ডাঃ শেঠীর ভাষায় তার জীবনে যতো প্রশংসা পেয়েছেন এর মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ প্রশংসা।

ডাঃ দেবী শেঠি নিজের মা-বাবার বরাবরের অসুস্থতার কারণে একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ডায়বেটিক রোগী। ডায়াবেটিকস বাড়ার কারণে পিতাকে তিনি অনেকবার অজ্ঞান হয়ে পড়তে দেখেছেন। এই পরিবারের কাছে তখন ডাক্তারের চেহারাটাই ছিল যেন এক ঈশ্বরের মূর্তি। কারণ চরম মূহুর্তে ওই ডাক্তারই ডাঃ দেবী শেঠির মা-বাবার জীবন বাঁচাতেন।

ডা. দেবী শেঠি যেসব শিশুর হার্ট সার্জারি সম্পন্ন করেন তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবার থেকে আসা এবং এদের সবাইকেই তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসা করেছেন। দেবী শেঠি তার নারায়ণা হৃদয়ালয় হাসপাতালে গিয়ে কোনো রোগী অর্থাভাবে চিকিৎসা বঞ্চিত না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখেন।

error: লাল সবুজের কথা !!