সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার ও নিধনে বেপরোয়া অসাধুরা

55

ওবায়দুল কবির সম্রাট, কয়রা প্রতিনিধি : খুলনার সুন্দরবনের খাল ও নদীতে নজরদারির অভাবে কীটনাশক দিয়ে মাছ শিকার ও নিধন কোনভাবেই থামছে না। জেলে নামধারী সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা দাদনদাতা ও আড়ৎদারদের উৎকোচ ও ছত্রচ্ছায়ায় সুন্দরবনে কীটনাশক প্রয়োগ করে মৎস্য সম্পদ নিধনে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতে করে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও জলজ প্রাণী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এমনটাই বলছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসকল এলাকায় বনরক্ষকরা তৎপর থাকলেও অসাধু জেলেদের বেপরোয়া বিষ প্রয়োগ ও মাছ সংগ্রহ হরহামেশাই চলছে। কয়রার জোড়শিং, পাতাখালি, গোলখালি, আংটিহারা, ৬নং কয়রা, পাথরখালি, মঠবাড়ি ৪নং কয়রা, তেতুলতলাচর, শেখেরকোনা, কালিবাড়ি, মহেশ্বরীপুর, বানিয়াখালি, হড্ডা, দাকোপ, সুতারখালি, কালাবগি সহ স্থানীয় শতাধিক জেলে গোনের শুরুতে ঘন ফাঁসের চরপাতা জালের পাস পারমিট কিংবা বিনা পাস পারমিটে মরা গোনে নিষিদ্ধ ভেষালি জাল নিয়ে বনের গহীনে প্রবেশ করে।

দুর্বৃত্তরা বনে প্রবেশের সময় নৌকায় বিষাক্ত রিপকর্ড বিষ নিয়ে যায়। পরে জোয়ার হওয়ার কিছু আগে কীটনাশক চিড়া, ভাত বা অন্য কিছুর সাথে নদী ও খালের পানির মধ্যে ছিটিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই এলাকায় থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিষের তীব্রতায় নিস্তেজ হয়ে পানিতে ভাসতে থাকে। এসময় চাকা ও চালি চিংড়ি সহ বড় বড় মাছগুলো শিকার করে স্থানীয় বাস, ট্রাক ও পিকআপ যোগে লোকালয়ে সরবরাহ করা হয়। অথচ মাছে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে কি না? পরীক্ষা করার কোনো পরীক্ষাগার ও উদ্যোগ নেই বন বিভাগের।

এসকল মাছ কয়রায় স্থানীয় মাছের ডিপো, মাছ ব্যবসায়ি, দেউলিয়া বাজার মৎস্য আড়ৎ, ফুলতলা মিনি আড়ৎ ও চাঁদালি মৎস্য আড়তে বিক্রি করে আর্থিক ফায়দা লুটে নিচ্ছে ওই সকল মৎস্য দুর্বৃত্তরা। সম্প্রতি ৬নং কয়রা এলাকা থেকে পুলিশ সুন্দরবনের নদীতে কীটনাশক প্রয়োগে শিকার করা ১২০ কেজি চাকা চিংড়ি সহ ৩ জেলেকে আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। কিন্তু প্রশাসনের এমন অভিযান অনিয়মের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, জেলে নামধারী মৎস্য দুর্বৃত্তরা স্থানীয় কিছু মৎস্য আড়ৎদার, দাদনদাতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের পোষা লোক। তারা মূলত অধিক মুনাফার লোভে জেলেদের মোটা অঙ্কের দাদন দিয়ে এ কাজ করান। তাদের সহায়তা করে কিছু অসাধু কীটনাশক বিক্রেতা। জেলেরা ওই বিক্রেতাদের কাছ থেকে অবাধে কীটনাশক সংগ্রহ করে মাছ ধরার কাজে অপব্যবহার করছে। এছাড়া বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাও উৎকোচের বিনিময়ে এসব জেলেকে বনে মাছ ধরার অনুমতি দেন। অথচ এসব আড়ৎদার, দাদনদাতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের নামের তালিকা নেই বন বিভাগ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায় উপজেলা সদরের লোকালয় গড়ে ওঠা অবৈধ শুটকি ব্যবসায়ীরা মোটা অংকের দাদন এর সাথে জেলেদের হাতে তুলে দিচ্ছে কীটনাশক। এরা একদিকে ধ্বংস করছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ অন্যদিকে বিষাক্ত চিংড়ি শুকানোর কালো ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ করে তুলেছে জনজীবন। খুঁটিতে বিষ প্রয়োগ কৃত চিংড়ি প্রতিনিয়ত শুকানো অব্যাহত থাকলেও প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া।

এদিকে পশ্চিম সুন্দরবনের অভয়ারণ্যাঞ্চল গেওয়াখালি, ভোমরখালি, পাথকস্টা, আদাচাকি, ছিচখালি, নীলকমল, পুস্পকাটি, নোটাবেকি, শাপখালি, আগুন জ্বালা সহ অন্যান্য নদী, খাল থেকে দাদন বা বিনা দাদনভুক্ত জেলেদের ধৃত বিপুল পরিমাণ চিংড়ি ও সাদা মাছ দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগর ও আশাশুনির অর্ধ-শতাধিক মাছ ব্যবসায়ি খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট মোকামে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে আসছে। ওই সকল মাছের বেশির ভাগ বিষ ক্রিয়ায় আক্রান্ত এবং কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই কেনা-বেচা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, ”কতিপয় অসাধু বনরক্ষীদের সাথে অবৈধ চুক্তি করে সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে খাল ও নদীতে অবাধে যথেচ্ছা কীটনাশক প্রয়োগ ও মাছ, কাঁকড়া আহরণ করছে এসকল দুর্বৃত্তরা।” সুন্দরবন খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের বজবজা, খাসিটানা, পাথকস্টা, গেওয়াখালি, নীলকমল, নোটাবেকি, পুস্পকাটি, টেংরাখালি টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বনরক্ষীরা উৎকোচের বিনিময়ে জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ দিচ্ছেন এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এ ব্যপারে জানতে চাইলে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এম,এ হাসান বলেন, ”বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার বন্ধ করতে বন বিভাগ জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।”

উল্লেখ্য, বিষ প্রয়োগে মাছ ধরলে শুধু সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বিষাক্ত ওই পানি পান করে বাঘ, হরিণ, বানর সহ সকল বন্য প্রাণীই জীবননাশের হুমকির মধ্যে পড়ে। এমনকি উপকূলীয় এলাকায় মানুষের পানীয় জলের উৎসগুলোও বিষাক্ত হয়ে যায়। কীটনাশক প্রয়োগ বনজ সম্পদ পাচার, বন্য প্রাণী নিধন, জলবায়ুজনিত পরিবর্তন ও দস্যুবৃত্তির চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা। সরকার সহ সকলের এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র ও পরিবেশ রক্ষায় এ সকল অবৈধ শুটকি অবৈধ স্থাপনা খুব দ্রুত উচ্ছেদ করা হবে।