সাতক্ষীরা ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাসের দুর্নীতি রুখবে কে?

145
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)’র আঞ্চলিক কার্যালয় সাতক্ষীরা, ইনসেটে ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস। ছবি- লাল সবুজের কথা।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)’র আঞ্চলিক কার্যালয় সাতক্ষীরা, ইনসেটে ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস। ছবি- লাল সবুজের কথা।

একস্থানে দীর্ঘ একযুগ চাকরি করার সুবাদে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সিন্ডিকেট, যাদের সমন্বয়ে করেন অপকর্ম আর দুর্নীতি

মো: জাবের হোসেন : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণার একটি প্রধান অঙ্গ হচ্ছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), যা দেশের প্রধান খাদ্য ধান উৎপাদন ও উন্নত জাত উন্নয়নে কাজ করছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ১৯৮৫ সালে খুলনায় শুরু হয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের কার্যক্রম। তবে এর গবেষণা কার্যক্রম শহরের নিরালার একটি ভাড়া বাড়িতে ১৯৯৬ সালে শুরু হলেও পরবর্তীতে পহেলা আগস্ট ১৯৯৯ সালে এটি স্থানান্তর করা হয় সাতক্ষীরা জেলায়। প্রথমে শহরতলীর একটি ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম শুরু করে। পরে ১২ই মে ২০১১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাতক্ষীরা শহরের অদূরে বিনেরপোতা নামক স্থানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছেড়ে দেয়া জায়গার ৫৩.৬৯ একর জমি ব্রি, আঞ্চলিক কার্যালয় সাতক্ষীরার অনুকূলে হস্তান্তর করে। মূলত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশেষ করে উপকূলীয় খুলনা-সাতক্ষীরা-বাগেরহাট-যশোর জেলার বিস্তীর্ণ লবণাক্ত অঞ্চলের (গাঙ্গেয় টাইডাল প্লাবনভূমি, কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-১৩) উপযোগী ধানের জাত ও টেকসই ধান উৎপাদন ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবনসহ খামারের সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এই অঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান লক্ষ ও উদ্দেশ্য।

অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতায় ভরে ফেলেছেন আঞ্চলিক এ অফিসকে। অফিসের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে তৈরি করে ফেলেছেন নিজস্ব নিয়ম। নিজের তৈরি করা নিয়ম না মানলে তাকে একঘুরে করে রাখা হয় এমনটি অভিযোগ অনেকের। একের পর এক অনিয়ম আর দুর্নীতি করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউন (ব্রি) সাতক্ষীরার বিনেরপোতার ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস। দীর্ঘদিন একস্থানে চাকরি করার সুবাদে তিনি গড়ে তুলেছেন সংঘবদ্ধ চক্র। তার অনিয়ম আর দুর্নীতির জন্য গড়ে তুলেছেন সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকার নিজস্ব কিছু মানুষের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট। যাদের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন জিনিস ক্রয়-বিক্রয় সহ দুর্নীতি করেন এই ফার্ম ম্যানেজার।
সরোজমিনে তদন্ত করে জানা গেছে, সাতক্ষীরার বিনেরপোতায় অবস্থিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউন (ব্রি)’র ফার্ম ম্যানেজার খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার আলাইপুর গ্রামের নারায়ন চন্দ্র বিশ্বাসের পুত্র অসিম কুমার বিশ্বাস ২০০৯ সাল থেকে এখানে চাকরি করছেন। দীর্ঘ ১২ বছর চাকরি করার সুবাদে তিনি এখানে নানা অনিয়মের সাথে জাড়িয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি সরকারি ধান চুরি করে বাইরে বিক্রিকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধানকালে তার সিমাহীন দুর্নীতির সন্ধান পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে সদরের থানাঘাটায় ব্যবসায়ী আবু মুছার কাছে সাত বস্তা ধান বিক্রি করে সরকারি জিপে করে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসে গত কয়েকেদিন আগে ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস। লেবার ও ড্রাইভার নগরঘাটা ইউনিয়নের ত্রিশমাইল এলাকার লস্কর ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন বাড়ি দেবেন্দ্র নাথ বাছাড়কে দিয়ে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্থ থাকেন বলে অনেকের অভিযোগ রয়েছে। উক্ত সাত বস্তা ধান তাকে সাথে নিয়েই চুরি করে বিক্রি করে এসেছে বলে জানাজানি হয়েছে। যার সত্যতা সেখানকার অধিকাংশ শ্রমিকেরা দিয়েছে।
সরোজমিনে দেখা গেছে উক্ত দেবেন দীর্ঘদিন ধরে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরকারি জায়গায় ঘাষ চাষ করে নিজের গরুর খামার করছেন। যার সহযোগিতা করছেন ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস নিজেই। দেবেন্দ্র নাথ বাছাড়ের গরুর খামারে ফার্ম ম্যানেজারের শেয়ার আছে কিনা বললে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, গরুর খামার করার সময় স্যারের (ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস) কাছ থেকে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলাম। সরকারি জায়গায় তিনি কেনো ঘাষ চাষ করে নিজ গরুর খামার করেছেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি স্যারেরা জানেন। আমাকে বছর খা’নেক আগে ঘাষ তুলে নিতে বলেছিলেন তবে তারপর থেকে আজ অবধী কিছু না বলায় আমি গুরুত্ব দেইনি।
দেবেনের গরুর খামারে শেয়ার আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস বলেন, আমি কারোর কোনো গরুর খামারের সাথে শেয়ার নেই। তবে কেনো তাকে গরুর খামার করার সময় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন আমি দেবেনকে কোনো টাকা দেইনি। তবে সরাসরি তাদের দুইজনকে একজায়গায় করে কথাটি জানতে চাইলে দেবেন ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাসের সামনেই ১ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা ফার্ম ম্যানেজার (অসিম) তাকে (দেবেন) দিয়েছেন বলে প্রমাণ করেন। এমন কথা শুনে ফার্ম ম্যানেজার নিজের মিথ্যা বলার কারনে চুপসে যায়। তবে গবেষণা কেন্দ্রের অধিকাংশ শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায় দেবেনের সাথে ফার্ম ম্যানেজারের গরুর খামারে শেয়ার থাকায় তাকে সরকারি জায়গায় ঘাষ লাগিয়ে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে আসছেন। আর দেবেনও সে সুযোগ ব্যবহার করে বাড়িতে গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। সরকারি চাকরি করে আবার সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত কাজে।
অপরদিকে সংবাদ সংগ্রহের তদন্তকালে আরো জানা যায়, গবেষণা ইনস্টিটিউটের খামারে প্রতি বছর খন্ডকালিন বা মৌসুমভিত্তিক কিছু শ্রমিক কাজ করে থাকেন। সরকারি হিসাবে প্রতি শ্রমিকের ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি বরাদ্ধ থাকলেও ফার্ম ম্যানেজার ২৫০-৩০০ টাকার বেশি দেন না। কথা বলতে গেলেই সে শ্রমিক বাদ দিয়ে দেন। কাজ হারানোর ভয়ে শ্রমিকেরা চুপ করে থাকেন।
ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাসের কাছে তার অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সদরের থানাঘাটায় ব্যবসায়ী আবু মুছা আমাদের এখান থেকে সরকারি ধান ক্রয় করেন। সাত বস্তা ধান চুরি করে বিক্রি করার কথা অস্বীকার করে বলেন, সেদিন আমরা (ফার্ম ম্যানেজার) ও পাশ দিয়ে অফিসে ফিরছিলাম, তখন আবু মুছা যে যানবাহনে করে ধান নিয়ে যাচ্ছিলেন সেটি খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমি সরকারি গাড়িতে করে তার সাত বস্তা ধান পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি, সেগুলো আমাদের ধান না। সরকারি গাড়িতে করে উল্টো পথে কেনো পৌঁছিয়ে দিলেন এমন প্রশ্নের কোনো জবাব তিনি দিতে পারেন নি। তাছাড়া সংবাদ সংগ্রহকালে আরো জানা গেছে, উক্ত ধানগুলো বস্তায় করে লেবেল ছাড়া তিনি খামারের গুদামঘর থেকে বের করে দেবেনের সহযোগিতায় নিজে গিয়ে দিয়ে আসেন।
দেবেন্দ্র নাথ বাছাড়ের সরকারি জায়গায় ঘাস লাগানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেবেনকে ঘাষগুলো ২/৩ মাস আগে কেটে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিলো। কিন্তু সে এখনো কাটেনি তবে খুব দ্রæত এ বিষয়টা সমাধান করা হবে।
খন্ডকালিন বা মৌসুমভিত্তিক শ্রমিকদের নায্য মূল্য না দিয়ে টাকা কেটে রাখার বিষয়ে ফার্ম ম্যানেজার বলেন, বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা জানেন। এমনকি সদর দপ্তর গাজিপুরের কর্মকর্তারাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তিনি ব্যাখা দিয়ে বলেন, সরকার হয়তো একটি জমিতে ৪০ জন শ্রমিকের কাজ করার জন্য ৪০০-৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করেন। কিন্তু তাতে দেখা গেলো হয়না, সেকারনে আমরা অতিরক্তি শ্রমিক কাজে লাগিয়ে টাকাগুলো সবার মধ্যে সমন্বয়সাধন করে থাকি। তবে সরকারি এমন নিয়ম আছে কিনা এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেন নি। এমনকি তিনি কোনো ডকুমেন্টস্ দেখাতে পারেন নি।
তবে গত ৬ ডিসেম্বর (সোমবার) সকাল ১১.১৮ ঘটিকায় মোবাইলের মাধ্যমে কথার বলার এক পর্যায়ে ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাস এই প্রতিবেদকের সাথে সরাসরি বিকালে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে বলেন, আসেন একটু একসাথে বসে চা খায় আর কথা বলি। কি কথা বলবেন, ফোনে বলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন আসেন আগে তারপর বলবো। কিন্তু এই প্রতিবেদক যেতে রাজি না হওয়ায় কয়েকবার অনুরোধ জানান। তারপর ফার্ম ম্যানেজার বলেন, আপনি তো পত্রদূতের সাংবাদিক তাই না?
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)’র আঞ্চলিক কার্যালয় সাতক্ষীরার ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রধান ড. এস এম মফিজুল ইসলাম ফার্ম ম্যানেজার অসিম কুমার বিশ্বাসের এসব অপকর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, আমি এসব ঘটনার কিছুই জানিনা। তবে দেবেনের ঘাষ লাগানোর বিষয়টা আগের যিনি এখানকার প্রধান ছিলেন তার সময়কার, আমি তাকে ঘাষ কেটে নেওয়ার কথা বলেছি। দুর্নীতি করলে ছাড়ের কোনো সুযোগ নেই। ঘটনা সঠিক হলে তদন্ত করে সরকারি নিয়মানুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সদর দপ্তর গাজীপুরের মহাপরিচালক ড. মো: শাহজাহান কবীরের সাথে কয়েকেবার মোবাইলে যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি বলে তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।