সর্বশেষ সংবাদ

সমালোচনা নয়,উৎসাহ দরকার

মোঃ জাবের হোসেন

মাত্র কয়েকদিন অাগে শেষ হলো বিশ্বকাপ ফুটবল।একেবারেই নতুন দল হিসাবে এবারই প্রথমে ফাইনাল খেলেছে ক্রোয়েশিয়া।তারা এতটা অাশাবাদি ছিলোনা যে তারা ফাইনালে খেলবে।তারা চেয়েছিলো খেলবে সাধ্যমত কাপ নেয়ার জন্য।কিন্তু জিততে না পারলেও তাদের কোনো অাফসোস নেই।কারণ তারা নতুন দল হিসাবে বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলছে তাতেই তাদের প্রশান্তি। খেলায় হার-জিত থাকবে এটা স্বাভাবিক।ক্রোয়েশিয়া -ফ্রান্সের খেলায়ও সেটা হয়েছে।

কিন্তু সমালোচনার বিষয় বস্তু হয়ে উঠেছে ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রাবার কিতারোভিচকে নিয়ে।ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট। এরসাথে তিনি না কি বিশ্বের সব থেকে অাবেদনময়ী নারী প্রেসিডেন্ট! সমুদ্র সৌকতে তোলা ২০০৯ সালে কিছু ছবিকে নিয়ে মিডিয়ায় চলছে সমালোচনার ঝড়।অাদৌ কি সেই ছবি তার! তার চেহারার সাথে সাদৃশ্য রয়েছে মার্কিন মডেল অস্টিনের।বিকিনি পরা ছবিগুলো কি সত্যি তার! না কি অন্য কারোর! কীভাবে পঞ্চাশ বছর বয়সে একজন নারী নিজেকে অাকর্ষণীয় রেখেছে! ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে মিডিয়া জগতে ঝড় উঠেছে।কোলিন্দা গ্রাবার কিতারোভিচ ২০১৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে তার বেশ সুনাম রয়েছে।অনেকেই বলছে ছবিগুলো যখন তিনি প্রেসিডেন্ট হননি তখন তোলা।

এরকম সমালোচনায় তিনি এই প্রথম পড়েন নি,এর অাগেও কয়েকবার তিনি এই একই সমস্যায় পড়েছিলেন।

১৯৬৮ সালের ২৯ এপ্রিল ক্রোয়েশিয়ার রিজিকা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন কোলিন্দা গ্রাবার। ওই সময় যুগোস্লােভিয়ার অধীনে ছিল ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৬ সালে তিনি জ্যাকব কিতারভিচ নামের একজনকে বিয়ে করেন। ৫০ বছর বয়সী এ নারী দুই সন্তানের জননী। এক ছেলে ও এক মেয়ের মা কোলিন্দা গ্রাবার কিতারোভিচ। তাদের বড় মেয়ে ক্যাটরিনার বয়স ১৭ বছর। আর ২০০৩ সালে তাদের সংসারে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান লোকা।

শুধু রূপ নয় মেধার গুণেই তিনি হয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট। প্রথমে ইউনিভার্সিটি অফ জাগ্রেব থেকে ইংলিশ অ্যান্ড স্প্যানিশ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচারে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমি অফ ভিয়েনা থেকে কূটনীতি বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন। এরপর আবার ইউনিভার্সিটি অফ জাগ্রেব থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স-এ অর্জন করেন মাস্টার্স ডিগ্রি। ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যান জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে ফেলোশিপ নিয়ে পড়তে যান হার্ভাড ইউনিভার্সিটির কেনেডি স্কুল অফ গভর্মেন্ট-এ। ছিলেন জন হপকিন্স ইউনিভারর্সিটির ভিজিটিং স্কলার। সবশেষে ২০১৫ সালে কোলিন্ডা ইউনিভার্সিটি অফ জাগ্রেবের ইন্টারন্যাশলাল রিলেশনস ডিপার্টমেন্টে পিএইচডি করা শুরু করেন। তুখোড় একজন কূটনীতিক তিনি।অসাধারণ হয়েও তিনি ভীষণ সাধারণ প্রেসিডেন্ট। নির্বাচিত হয়েছেন জনগণেরই ভোটে। যিনি পাঁচটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন: যার মধ্যে আছে ক্রোয়েশিয়ান, ইংরেজি, সার্বিয়ান, স্প্যানিশ ও ড্যানিশ। এছাড়াও খুব ভালোভাবে বোঝেন ও কাজ চালাতে পারেন আরও চারটি ভাষায় সেগুলো হলো জার্মান, ফ্রেঞ্চ, রাশিয়ান ও ইটালিয়ান।

অসাধারণ এক উচ্চশিক্ষিত রূপবতী মহীয়সী নারী তিনি।ফুটবলকে তিনি কতটা ভালোবাসেন তা দেখেছে সারা বিশ্ব। দলকে উজ্জীবিত করার জন্য তিনি ড্রেসিং রুমে যেতেও দ্বিধা করেননি। না তিনি মাঠে নেমে ফুটবল খেলেননি। তবু প্রতিটা মুহূর্তে বুঝিয়ে দিয়েছেন উনি শুধু দেশের রাষ্ট্রপতি নন।দেশের সাধারণ জনতার মতোই ফুটবল ভক্ত।অসাধারণ হয়েও অতি সাধারণ একজন মানুষ।একজন সাধারণ সমর্থক। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে যিনি দলের জন্য চিৎকার করেন। জিতলে আনন্দে মাতেন। হারলে কাঁদেন। উনি আমাদের মতোই একজন।

তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন , ক্রোয়েশিয়া দেশটা ছোট হলেও, জনসংখ্যা আমাদের থেকে অনেক কম হলেও,তিনি তাদের যোগ্য নেত্রী। তার দেশ এমনি এমনিই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেনি।লড়াই করেছে। হারার আগে হেরে যায়নি, এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে বিশ্বকাপে।

অামরা সবসময় ভালো জিনিসের উল্টটা খুঁজে বেড়ায়। কাউকে উৎসাহের পরিবর্তে বঞ্চনা দিতে পছন্দ করি।ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টের ছবি নিয়ে মিডিয়ায় অনেক মাতামাতি হচ্ছে।ক্রোয়েশিয়া দেশটি ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত।বুকে বুক মেলানো,হাতে হাত দেওয়া,গালে-মুখে চুমো খাওয়াটা সেখানে স্বাভাবিক।কারণ তাদের সংস্কৃতি সেটাই।কিন্তু অামাদের ক্ষেত্রে হলে সেটা বেমানান।অামি ইউরোপ সংস্কৃতিকে মানতে বা সমর্থন করছিনা।অামি অামার নিজ দেশের সংস্কৃতি, নিজ দেশের অাচার-ব্যাবহারকে ভালোবাসি।তদ্রুপ সে দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট তাদেরকে ভালোবাসা জানিয়েছেন,উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।তাতে দোষের কিছু না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এমন ক’জন হয়? কোনো রাষ্ট্রের নায়ককে পৃথিবী কী দেখেছে এইরকম আগে? কোনো ছাঁচে ফেলা যায় না তাঁকে। যিনি আপামর মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন নিজের অসাধারণ ব্যাক্তিত্ব দিয়ে। তিনি হলেন প্রেসিডেন্ট অফ ক্রোয়েশিয়া কলিন্ডা গ্রাবার-কিতারোভিচ।

তাঁকে প্রথম দেখি কোয়ার্টার ফাইনালে, যেদিন মুখোমুখি হয়েছিল রাশিয়া ও ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। ম্যাচে পেনাল্টি শটে রুশদের হারায় ক্রোয়েটরা। এমন উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে হাজার হাজার সমর্থকের সঙ্গে মাঠে সাক্ষী ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্টও।মাঠে হাজার হাজার দর্শকদের মাঝে দেশের জার্সি গায়ে অপরূপা তিনি।মড্রিচদের খেলা উপভোগ করলেন সাধারণ মানুষের মতোই আনন্দে, উচ্ছ্বাসে।না,কোনো কোটি টাকার পোশাক নয়, তিনি তো দেশপ্রেমী, তিনি ফুটবল প্রেমী। দেশের জার্সি গায়ে।

বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন সারা বিশ্ব দেখলো তাঁর ব্যাক্তিত্বের আরও এক রূপ।উষ্ণ আলিঙ্গনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানালেন। ক্রোয়েশিয়ার ক্যাপ্টেন লুকা মড্রিচ গোল্ডেন বল জেতার পর যখন ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে গেলেন মড্রিচকে জড়িয়ে ধরলেন উনি। কয়েক সেকন্ড,কয়েক মুহূর্ত। সাক্ষী থাকলাম সবাই।হেরে গেলেও বন্ধনটা ভাঙলো না। গোটা পৃথিবী থমকে গিয়ে দেখলো সেই বিরল দৃশ্য।প্রেসিডেন্টের চোখে জল। আবার তিনিই হাসি মুখে অভিনন্দন জানাচ্ছেন বিজয়ী দলকে।

আমাদের জীবনের ব্যর্থতার পরে কখনো কখনো এমন একজনকে খুঁজে চলি যে আমাদের বুঝবে, যে আমাদের হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে এগিয়ে চলো -আমি তো পাশেই আছি। যখন জীবন যুদ্ধে হেরে যাই, জড়িয়ে ধরার জন্য মানুষ একজনকে খুঁজে চলি, যার বুকে মাথা রেখে দুঃখগুলো, কান্নাগুলো ভুলিয়ে দেওয়া যায়।তিনি এমনই একজন এটাও প্রমাণ করে দিলেন দলের পাশে থেকে।

সারা বিশ্ব একজন অবিভাবককে দেখলো। কেঁদে ফেললেন তিনি লুকা মড্রিচকে জড়িয়ে। না, লুকা ও তার দল এতটুকু জমিও লড়াই ছাড়া ছেড়ে দেয় নি। এ পরাজয় ছিলো রাজার মতোই। বিশ্বাস করুন ওই কয়েক মুহূর্তে ছিলো শুধুই আন্তরিকতা। হেরে যাওয়ার কষ্টটা ভাগ করে নিচ্ছিলেন দুজনেই। ট্র্যাজিক হিরো মড্রিচকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তিনি।আবার ১৯ বছর বয়সী ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন তরুণ এবং উদীয়মান সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন, তাকেও আলিঙ্গন করলেন অবিভাবকের মতোই আনন্দের সাথে। বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যে তারা হেরে যায় নি।তারাই জিতেছে।হ্যাঁ তারাই পেরেছে সারা পৃথিবীর ভালবাসা আদায় করে নিতে।

ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ জিতে নিতে পারেনি।কিন্তু জিতেছে বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা। অার গ্রাবার জিতিয়ে দিয়েছেন তার দেশকে।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক,লাল সবুজের কথা ডট কম

error: লাল সবুজের কথা !!