সর্বশেষ সংবাদ

সন্ধ্যাকালীন কোর্সের উদ্দেশ্য শিক্ষা না বাণিজ্য?

শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। মানুষ জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করে থাকে। শিক্ষা যেমন ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয় তেমনি ব্যক্তিকে সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করে়।

সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জন করার নামই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। এক কথায় শিক্ষা হল সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। বলা হয়ে থাকে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। এটা যে শুধু কথার কথা তা কিন্তু নয়, এটাই চরম বাস্তব। কেননা শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতিই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। শিক্ষা হলো সেই শক্তি যা সমাজ থেকে কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অপশক্তি ও বিশৃঙ্খলতা দূর করতে সাহায্য করে। সে কারণে প্রতিটি দেশের উন্নয়নের মূল শর্ত হচ্ছে শিক্ষিত মানুষের হার বৃদ্ধি করা। তবে মনে রাখতে হবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে তো? নাকি আমরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি ? অবশ্য এসব প্রশ্ন উত্থাপনের পেছনে অনেক কারণও আছে।

আজ থেকে কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে চালু হয়েছিল সন্ধাকালীন কোর্স যা এখনো বিদ্যমান আছে। এসব সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাতে এসব কোর্সে ভর্তি হয়ে সর্বগুণে গুণান্বিত হয়ে মেধার দৌড়ে প্রতিযোগিতায় আরো বেশি এগিয়ে যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিষয়টিকে সেভাবেই চিন্তা করেছিল।

সত্যিকার অর্থেই আজকের মতো ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে এসব সন্ধ্যাকালীন কোর্সের শুরু হয়নি। কিন্তু হায়! আজ এর চরম ব্যতিক্রম লক্ষণীয়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু হওয়ার পর থেকেই এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। সন্ধ্যাকালীন কোর্সে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও বেড়ে গেছে আগের চেয়ে বহুগুণ। এসকল কোর্সে যারা ভর্তি হন, তাদের বেশির ভাগই পেশাজীবী। তাদের চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন। নিয়মিত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছেনও তাদের অসুবিধার কথা কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।বর্তমানে তো হিতে বিপরীত অবস্থা। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে যেখানে সন্ধ্যাকালীন কোর্স বন্ধ করে দেওয়ার কথা, সেখানে যে ডিপার্টমেন্টগুলোতে এখনো সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু হয়নি, সে ডিপার্টমেন্টগুলোতেও তা খোলার চেষ্টা চলছে খুবই আন্তরিকভাবে। এর পেছনে অবশ্য কারণও আছে।

অন্যতম হল যতবেশি ডিপার্টমেন্টে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু হবে ততবেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তির সুযোগ তৈরী হবে। যতবেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি হবে ,ততবেশি টাকা। যার কারণে নতুন নতুন বিভাগে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালুর এতো তোড়জোড়। কিন্তু এই সকল সন্ধ্যাকালীন কোর্সে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে কি না তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। বরং যে বা যারা সন্ধ্যাকালীন কোর্সের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তাদেরকে বিভিন্ন উপায়ে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখনো দেওয়া হচ্ছে । ফলে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রির প্রসার বাড়ছে ঠিকই,কিন্তু গুণগত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, শিক্ষার্থীরাও গুণগত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, অভিযোগ আছে সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালুর কারণে আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমগুলো চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত কোর্সগুলো ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হল বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের নিকট নিয়মিত কোর্সের চেয়ে সন্ধ্যাকালীন কোর্স অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অবশ্য এর কারণও আছে। কেননা বর্তমানে সন্ধ্যাকালীন কোর্সে পড়ানোটা খুবই লোভনীয় একটি ব্যাপার । যিনি যত বেশি কোর্স নেন তিনি ততবেশি লাভবান হন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদান অনেক শিক্ষকের কাছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেকটাই গৌণ হয়ে পড়েছে। বিভাগে যে ক্লাস রুটিন দেয়া হয়, অনেক সময় তা অনুসরণ করেন না সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ক্লাস নেওয়া অনেক শিক্ষকই।

ঠিকমতো ক্লাস না নেয়ার ফলে সিলেবাস বাকি থেকে যায়। এ রকম পরিস্থিতিতে সেমিস্টারের শেষ মুহূর্তে এসে অনেক শিক্ষকই বিশেষ সাজেশনস দিয়ে নিজের দায়িত্ব থেকে দায়মুক্তি পেতে চান। আবার অনেক শিক্ষকই পরীক্ষার আগে আগে সিলেবাস শেষ করার তাগিদে এত বেশি অতিরিক্ত ক্লাস নেন যা শিক্ষার্থীদের ওপর অহেতুক প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। উচ্চশিক্ষার প্রসার ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি উদারচিত্তে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের সুবিধা গ্রহণ করতো, তবে তা হতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তা হয়ে ওঠেনি।

আমাদের দেশটি খুবই ছোট্ট। প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। কিন্তু সে অনুপাতে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে চাহিদার তুলনায় প্রচুর আসন সংকট।

ফলে অনেকেই এসএসসি ও এইচএসসিতে ভাল ফলাফল করা সত্ত্বেও ভাল ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায় না এবং বর্তমানেও একই অবস্থা বিরাজমান। কিন্তু ভাল প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা লাভের আগ্রহটা তাদের থেকেই গেছে।বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যাকালীন কোর্স চালু করার ফলে তাদের অনেকেই নামমাত্র ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে নিয়মিত শিক্ষার্থীর দ্বিগুণ বা তারও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ নিচ্ছেন এসব কোর্সে। সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ভর্তি হওয়ার উদ্দেশ্য যতটা না উচ্চশিক্ষা লাভ, তার চেয়েও বেশি ডিগ্রি অর্জন। কেননা বর্তমানে অর্থনীতির ক্রমসম্প্রসারণে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি উচ্চতর ডিগ্রি। তাই দ্বিধাহীনচিত্তেই এ কথা বলা যায় দুই একজন ব্যতিক্রম থাকলেও থাকতে পারে, তবে অধিকাংশই সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ভর্তি হন উচ্চতর মানসম্মত শিক্ষা নয়, বরং উচ্চতর ডিগ্রি লাভের প্রত্যয়ে। এমতাবস্থায় একটি কথা সবার মনে রাখা উচিত একজন মানুষের উচ্চ শিক্ষা লাভ করার পাশাপাশি মনুষত্ব অর্জনের শিক্ষা নেয়াটাও জরুরি।

উচ্চশিক্ষা শুধু সার্টিফিকেটে উচ্চ হলেই হবে না মন ও মননশীলতায়ও উঁচু হতে হবে। সন্ধ্যাকালীন কোর্সে উচ্চশিক্ষার যে বেহাল দশা তাতে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তা দ্বারা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার প্রসারে সান্ধ্য কোর্সের গ্র্যাজুয়েটদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মর্যাদাহানি ঘটছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হলে এখন থেকে খুব গভীরভাবে সন্ধ্যাকালীন কোর্স নিয়ে ভাবতে হবে। প্রয়োজনে বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে।

বর্তমানে সন্ধ্যাকালীন কোর্সের যে হযবরল অবস্থা সার্বিক বিবেচনায় এটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। তবে কোনো কারণে যদি সন্ধ্যাকালীন কোর্স একান্ত চালু রাখতেই হয়, তাহলে সেখানে অবশ্যই বাণিজ্যের পরিবর্তে শিক্ষা প্রসারের বিষয়টি গুরুত্বের আওতায় আনতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান, ডিগ্রির মান নিশ্চিত করতে হবে। আসুন, শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে নয়, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আমরা উদ্যোগী হই।

লেখক: সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ,বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

error: লাল সবুজের কথা !!