সত্যি কি ভালো আছে বাঘ বিধবা ভূমি কন্যা রূপামণি মুন্ডা

173

আব্দুল হালিম, শ্যামনগর ।। ৪০ বছর আগে বাঘের আক্রমণে স্বামী কৈখালী ইউনিয়নের মুন্ডাপাড়ার রূপামণি মুন্ডা। স্বামী ছিলেন বনজীবী; সংসার চলত মাছ ধরে, কাঠ কেটে, মধু সংগ্রহ করে। রূপামণির কোলে যখন পাঁচ-পাঁচটি নাবালক শিশু, তখন মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে স্বামী লক্ষ্মণ মুন্ডা আর ফিরে আসেনি। পিতার চিতাভষ্মটুকুতে শেষ প্রণাম জানাতে পারেনি সন্তানেরা ; একই খেদ তাঁর মনেও।

এরপর নেমে আসে রূপামণির জীবন সংগ্রামের কঠিন অধ্যায়। ধনীদের বাড়িতে ধান ভেনে (ঢেঁকিতে), ক্ষুদ সংগ্রহ করে, পান্তার (রাতের ভিজানো ভাত) পানি চেয়ে উদরপূর্তি করেছে দিনের পর দিন। কোনোদিন তিনবার খাওয়া জোঠেনি তাঁদের সংসারে।

এভাবে কালিন্দী দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে অনেক জল। শুধু সময় ছুটেছে সময়ের তালে, ভাগ্য ফেরেনি রূপামণির জীবনের চাকার। এভাবে ছোট কাল থেকে ছেলে-মেয়েরা জন মজুরি দিয়ে বড় হয়েছে, সংসার করেছে। এখন আর খাওয়ার কষ্ট নেই তাঁদের। রূপামণি দ্বিতীয় শৈশবে জীর্ণ ঘরের বারান্দায়, শীর্ণ দেহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন পরপারের।

অথচ ভারতবর্ষে মুন্ডাদের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আর্যদের আগমনের পূর্বেই এদেশের আদি সন্তান মুন্ডা, কোল, সাঁওতাল ইত্যাদি নৃগোষ্ঠী। জঙ্গল আর ভূমি ছাড়া মুন্ডাদের জীবন কল্পনা করা যায় না। অথচ কালের বিবর্তনে সেই প্রকৃতির আদি সন্তানেরা আজ ভূমিহীন বিচ্ছিন্ন।

১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে ব্রিটিশ সরকার আচমকা ঘোষণা দেন ভূমির উপর মুন্ডাদের কোনো অধিকার নেই। বাধ্য হয়ে তাঁদের আদি নিবাস ঝাড়খণ্ড ছাড়তে হয়। ছড়িয়ে পড়ে আন্দামান, ভুটান, উড়িষ্যা ও বাংলাদেশের জঙ্গলাকীর্ণ কিছুটা মানব বসতি বিচ্ছিন্ন এলাকায়। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন সাঁওতাল এবং মুন্ডা সম্প্রদায়। শহিদ হন বীরশা মুন্ডা।

ইংরেজ, জমিদার, জোতদার, মহাজন এঁদের থেকে লাঞ্ছিত হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এভাবে একদিন হারিয়ে ফেলেছে নিজেদের ধর্ম ‘আদিধার্ম’ ও সৃষ্টিকর্তা ‘সিংবোঙ্গা’ -এঁর নামও। সংস্কৃতির সাথে হারিয়ে গেছে এদের নিজস্ব ভাষাও। বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে যুক্ত ‘কুড়ি’, ‘চুলা’ এসব শব্দগুলো মুন্ডারি ভাষার। হায়র নিয়তি! প্রকৃতির ভূমি সন্তানেরা আজ প্রকৃত ভূমিহীন।