সতর্ক ও সচেতন হওয়া দরকার

মো. জাহানুর ইসলামঃ একটা সময় ছিল যখন কলেরা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে হাজার হাজার মানুষ মারা যেত।ধ্বংস হয়ে যেত গ্রামের পর গ্রাম।সময়ের বিবর্তনে কলেরা রোগ আজ আর মহামারি কোন রোগ নয়।কলেরা রোগের ঔষুধ, ভ্যাকসিন সব কিছুই আবিষ্কৃত হয়েছে।কলেরা রোগ দেখা দিলে এখন আর মানুষের মনে কোন আতঙ্ক কাজ করে না। বর্তমানে মানুষ কলেরা রোগ নিয়ে আতঙ্কিত না হলেও হেপাটাইটিস ভাইরাস নিয়ে বেশ আতঙ্কিত। কেননা এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসের তেমন কোন প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি।যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা আসতে শুরু করেছে,তবে সেটা খুবই সীমিত আকারে।

হেপাটাইটিস ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে।সর্বশেষ গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে ৮৫ লাখ এবং অবশিষ্টরা সি, ই, এ দ্বারা আক্রান্ত। গবেষণা অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৫.১ শতাংশ বি ভাইরাসে ও ০.২ শতাংশ সি ভাইরাসে আক্রান্ত। গবেষকেরা জানিয়েছেন, আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশই জানে না যে, তারা ঘাতক ব্যাধি হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। শেষ মুহূর্তে কাবু হয়ে যখন তারা চিকিৎসকের কাছে যান তখন বিষয়টি জানতে পারেন। কিন্তু তখন আর আসলে তেমন কিছু করার থাকে না।গবেষণা অনুসারে আমাদের দেশে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বি ভাইরাসে আক্রান্তদের হার সবচেয়ে বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে গ্রামের কৃষকের সংখ্যাও কম নয়। কৃষকদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৮.৯ শতাংশ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ৫ ধরনের হেপাটাইটিস রয়েছে।আমাদের দেশে এই পাঁচ ধরনের ভাইরাসই রোগী আছে। হেপাটাইটিস এ এবং ই স্বল্পমেয়াদী লিভার রোগ। বিশ্রাম নিলে এক পর্যায়ে এগুলো থেকে সেরে ওঠা যায়।কিন্তু প্রাণঘাতী হচ্ছে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের সংক্রমণ।এ হেপাটাইটিস সংক্রমণ বাংলাদেশে জনসাধারণের মধ্যে জন্ডিস রোগ হিসেবে পরিচিত। প্রকৃত অর্থে হেপাটাইটিস হলো ভাইরাসজনিত লিভারের রোগ।হেপাটাইটিস বি ভাইরাস অনিরাপদ যৌন কর্ম ও রক্তের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে।অনেক সময় মায়ের কাছ থেকেও শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এই রোগের ভাইরাস ।আর নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োঃ ব্যবস্থাপনার অভাবে হেপাটাইটিস এ ও সি দ্বারা আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়।অধ্যাপক নুরুদ্দীন আহমদের মতে, বাংলাদেশে গর্ভবতী মায়ের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয় হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে।গর্ভাবস্থায় লিভার অকেজো হয়ে প্রসূতি মায়েরা মারা যান। আবার বি ভাইরাস মা থেকে সন্তানের মধ্যেও চলে যায়।তবে গর্ভাবস্থায় মাকে ভ্যাকসিন দেয়া হলে তা প্রতিরোধ করা যায়। আবার সন্তান জন্মের ১২ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন দিয়েও শিশুকে হেপাটাইটিসমুক্ত রাখা যায়।ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বলেন, ”হেপাটাইটিস বাংলাদেশে এটা একটা নীরব ঘাতক। বিশ্বে যত মানুষের লিভার ক্যান্সার হয় তার ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী হচ্ছে এই হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস। পৃথিবীতে গড়ে প্রতিদিন ৪ হাজার মানুষ লিভার রোগে মারা যায়।”

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস নিয়ে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।সুস্থ অবস্থায় হেপাটাইটিস ভ্যাকসিন নেয়া হলে যে বি ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকা যায় তা এখনো অনেকেই জানে না।তাই মানুষকে এ সম্পর্কে জানাতে হবে।”হেপাটাইটিস রোগ নিয়ে সরকারকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। এ রোগ প্রতিরোধে সরকারের দীর্ঘ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া উচিত। হেপাটাইটিসের চিকিৎসা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।একটু সতর্ক ও সচেতন হলেই এ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

লেখক : সভাপতি,বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

error: লাল সবুজের কথা !!