সখিপুরে মাদকের আখড়া উচ্ছেদে পুরুষশূন্য গ্রাম

30
সখিপুরে মাদকের আখড়া উচ্ছেদে পুরুষশূন্য গ্রাম
সখিপুরে মাদকের আখড়া উচ্ছেদে পুরুষশূন্য গ্রাম

অবৈধভাবে দখল করা জমিতে গড়ে ওঠা মাদকের আখড়া উচ্ছেদের পর পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে শরীয়তপুরের সখিপুরের ছৈয়ালকান্দি গ্রাম।

এ সুযোগে গভীর রাতে স্থানীয় শীর্ষ মাদককারবারি বাবু মোল্লা ও তার ভাই সোহাগ মোল্লার নেতৃত্বে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন নারী ও শিশুরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সখিপুর থানার ছৈয়ালকান্দি গ্রামে স্থানীয় শীর্ষ ইয়াবা বিক্রেতা, হুন্ডি ও চোরাই তেলের ব্যবসায়ী বাবু মোল্লার মাদকের আখড়া উচ্ছেদ করে গ্রামবাসী।

এ সময় বাবু মোল্লা, শামীম মোল্লা, সোহাগ মোল্লা ও আসাদুল্লাহ মোল্লার নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল হামলা চালায়।

তখন গ্রামবাসী তাদের প্রতিহত করলে শামীম ও আসাদুল্লাহ আহত হন। এ ঘটনায় শুক্রবার সন্ধ্যায় ১৩ গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করে বাদী বাবু মোল্লা।

এর পরই গ্রামবাসীর ওপর চড়াও হন বাবু মোল্লার লোকজন। ঈদের ছুটিতে গ্রামটিতে বিভিন্ন স্থান থেকে বেড়াতে আসা অতিথিদেরও তারা হেনস্তা করতে থাকেন।

এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী কাঁচিকাটা ইউনিয়ন থেকে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসা লিটন সর্দারের (৪৫) ওপর সখিপুর বাজারে হামলার ঘটনা ঘটে।

বাবু ও সোহাগের নেতৃত্বে লিটন সর্দারকে লাঞ্ছিত করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর তাকে সখিপুর থানা পুলিশের হাতে তুলে দেন বাবু মোল্লা।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ছৈয়ালকান্দি গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাতেরবেলা গ্রাম থেকে পুরুষ ও কিশোররা গা-ঢাকা দেন।

আতঙ্কিত নারী ও শিশুরা দরজা-জানালা বন্ধ করে বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন। শনিবার সকালে ছৈয়ালকান্দি গ্রামের শ্রমজীবী ভুট্টো, মুসা, বিল্লাল, মেসবাহউদ্দিন ও জানশরীফের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তারা কেউ বাড়িতে নেই।

আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন তাদের স্ত্রী ও সন্তানরা। মুসার স্ত্রী জুলিয়া বলেন, হুনছি মাদক ব্যবসায়ীদের মামলায় আমার স্বামীর নাম আছে।

এ খবর হোনার পর হ্যায় রাইতে বাড়িত থাহে নাই। আমরা একলাই ভয়ে ভয়ে বাড়িত আছি। কখন কী অইয়া যায় আল্লায় জানে।

আমাদের দেখার কেউ নাই। জুলিয়া জানান, কয়েক বছর আগে গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের জমি দখল করে আলিশান বাড়ি তৈরি করে মাদককারবারি বাবু মোল্লা। সেখানে নিয়মিত ইয়াবা, গাঁজা ও মদ সেবন করা হয়।

ওই জমি দখলের বিরোধিতা করায় তার স্বামী মুসা ও দেবর ভুট্টোসহ গ্রামের শ্রমজীবীদের বাবু মোল্লা হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করেন জুলিয়া।

তিনি বলেন, বাবু মোল্লার মামলার ভয়ে পরিবারের একমাত্র উপার্জন মানুষটি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাড়িতে খাবারের ব্যবস্থা নেই। কিভাবে পরিবার চলবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। এর মধ্যে বাবু মোল্যার লোকজন আবার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দরিদ্র পরিবারের সন্তান অক্ষরজ্ঞানহীন বাবু মোল্লা আত্মীয়স্বজনদের সহযোগিতায় ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় যান।

পরে তিনি অবৈধভাবে সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার পর ২০০৮ সালে সিঙ্গাপুর পুলিশের হাতে ধরা পড়লে আঙুলের ছাপ রেখে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। খালি হাতে দেশে আসার পর বাবু অনেক দিন বেকার ছিলেন।

একপর্যায়ে বাবু নদীপথে বিভিন্ন জাহাজ থেকে আনা চোরাই তেলের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। জ্বালানি তেল বিক্রির জন্য কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও ড্রামে করে তেল এনে শরীয়তপুরজুড়ে সরবরাহ করেন বাবু।

এর মধ্যে ২০১০ সাল থেকে সিঙ্গাপুর নিবাসী ল সিউচেন নামে এক নারীর সঙ্গে মিলে হুন্ডি ব্যবসা শুরু করেন বাবু। ওই নারী বেশ কয়েকবার বাবুর বাড়িতে এসে অবস্থান করেন। ছৈয়ালকান্দির শ্রমজীবীদের জমি দখল করলে সিউচেনের টাকায় বিশাল একটি বাড়ি তৈরি করেন বাবু।

এ বাড়িতে প্রতি রাতেই ইয়াবা, মদ ও গাঁজাসহ জুয়ার আসর বসে। এ পর্যন্ত দুবার ইয়াবাকারবারি শামীমকে আটক করেছে সখিপুর থানা পুলিশ। তবে দুবারই মাদক ব্যবসা ও সেবন ছেড়ে দেবে বলে মুচলেকা দিয়ে শামীম ছাড়া পান। অভিযোগের বিষয়ে বাবু মোল্লার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ভাই সোহাগ মোল্লা বলেন, আমরা মাদকের সঙ্গে জড়িত নই। আমরা কাউকে হুমকি দিইনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুরের এসপি আব্দুল মোমেন বলেন, এ বিষয়ে আমি খবর নিচ্ছি। ঘটনার সত্যতা পেলে অবশ্যই মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ছৈয়ালকান্দি গ্রামের পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করলে সখিপুর থানার ওসি মঞ্জুরুল হক আকন্দ বলেন, জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্বে মামলা হয়েছে। মামলাটি করেছে বাবু মোল্লা।