ইসলামীক ডেস্ক: শামসুল আরেফীন, সুলতানুস সালেকীন, শায়খ ফরিদুদ্দীন গঞ্জেশকর মাসউদ ভারতবর্ষে চিশতিয়া সিলসিলার মুজাদ্দিদ ও দ্বিতীয় আদম। তারই দু’জন খলিফা সুলতানুল আউলিয়া খাজা নিজামুদ্দীন দেহলবী এবং শায়খ আলাউদ্দীন আলী সাবির পীরানে কলীরীর মাধ্যমে এই সিলসিলা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের খলিফা এবং মুরিদীনের দ্বারা আজও প্রতিষ্ঠিত ও জীবন্ত।
খাজা ফরিদুদ্দীনের প্রকৃত নাম মাসউদ, উপাধি ফরিদদুদ্দীন। সাধারণত ‘গঞ্জে শকর’ উপাধিতে সারা পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ। তিনি দ্বিতীয় খলিফা উমর রা. এর বংশধর ছিলেন। তার শ্রদ্ধেয় পিতামহ কাযী শুআইব তাতারী ফেতনার সময় কাবুল হতে লাহোরে আগমন করেন।
কিছুকাল কামুস নামক স্থানে অবস্থান করেন অতঃপর কাহীনওয়াল শহরের কাযীর পদ ও জায়গীর প্রাপ্ত হোন। কাহীনওয়ালে ৫৬৯ হিজরিতে খাজা গঞ্জেশকর জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় ভারতবর্ষের মধ্যে মুলতান জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। শায়খ বাল্যকালেই মুলতান সফর করেন এবং শহরের প্রথিতযশা শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন।
মাওলানা মিনহাজুদ্দীন তিরমিযীর কাছে আন-নাফে কিতাব অধ্যায়নকালে ৫৮৪ হিজরিতে খাজা কুতবুদ্দীন বখতিয়ার কাকীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার হাতে বায়আত হোন। শায়খ ফরিদুদ্দীন খাজা কাকীর ব্যক্তিত্বে এতই মুগ্ধ ও প্রভাবিত হয়ে পড়েন যে,তিনি শিক্ষার পাঠ পরিত্যাগ করে মুরশিদের সান্নিধ্য ও সাহচর্যে থেকে যাবার সংকল্প করে ফেলেন।
শায়খ কুতুবুদ্দীন তাকে বাধা প্রদান করেন এবং পড়াশোনা সমাপ্ত করার নির্দেশ দেন। শায়খ কাকী তাকে বলেন, ‘বে-ইলম দরবেশ শয়তানের ক্রীড়ানক হয়ে পড়ে।’ তাঁর মালফুযাত গ্রন্থ ‘রাহাতুল ক্বুলুব’ এর ভাষ্যমতে তখন তিনি ভারতবর্ষের বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
বাগদাদে তিনি শায়খুশ শুয়ূখ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে কিছু কাল কাটান এবং তার স্বরচিত আওয়ারিফুল মা’আরিফ এর কিছু অংশ পাঠ গ্রহণ করেন। এরপর শায়খ দামেস্ক, জেরুজালেম,নিশাপুর,গযনী,বাদাখশান ও বুখারা পরিভ্রমণ করেন। শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি স্বীয় শায়খ ও মুরশিদের খেদমতে দিল্লিতে গিয়ে উপস্থিত হোন। শায়খ তার অবস্থানের জন্য গযনী দরজার সন্নিকটে একটি জায়গা নির্বাচন করেন এবং সেখানেই তিনি রিয়াযত ও মুজাহাদা,কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন।
সূলুকের সব শাখায় উত্তীর্ণ হবার পর শায়খের ইযাযত লাভে ধন্য হোন। অতঃপর শায়খের অনুমতিতে তার একান্ত ভক্ত,অনুরক্ত জামালুদ্দীনের আবাসভূমি হাসিতে অবস্থান করে তা’লীম,তাবলিগ ও তাযকিয়ার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
শায়খ বখতিয়ার কাকী ইন্তিকালের সময় তার খিরকা ও অন্যান্য সামগ্রী কাযী হামীদুদ্দীন নাগোরীর নিকট রেখে যান এবং শায়খ ফরিদুদ্দীনকে পরিয়ে দেয়ার অসিয়ত করেন। অসিয়ত অনুযায়ী শায়খের সব আমানত তাকে অর্পণ করেন। আর এটা ছিল শায়খ ফরিদুদ্দীন গঞ্জেশকরকে স্থালাভিষিক্ত করে যাবার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তিনি খিরকা পরিধান করেন এবং স্বীয় শায়খ কাকীর স্থালাভিষিক্ত হোন।
তার খ্যাতি চারিদিক ছড়িয়ে পড়ে এবং ভক্ত মুরিদানের সমাগম বাড়তে থাকে। অবশেষে তিনি মুলতানের কাহিনওয়াল নামক স্থানের আজুদহনকে আবাস্থল হিসেবে নির্বাচন করেন। আজুদহনে কিছুদিন আর্থিক অনটনে দিনানিপাত করেন এমনকি গাছের পাতায় নবণ ছিটিয়ে গরীব জন সাধারণকে খাওয়াতেন এবং ভক্ত-মুরিদানসহ নিজেও খেতেন।
কিন্ত অল্প দিনেরই তার খ্যাতি ও মর্যাদা চারিদিক ছড়িয়ে পড়ে এবংভক্তের কথা শুনে তিনি অনেক কষ্ট পান এবং তখনই তিনি দিল্লি ত্যাগের মনস্থ করেন। তিনি হাসিতে বসবাস অবস্থান করতে থাকেন এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে অবস্থান করতে থাকেন। কিন্তু অল্প দিনেই তার খ্যাতি ও মর্যাদা চারিদিক ছড়িয়ে পড়ে এবং ভক্তদের ভিড় বাড়তে থাকে। অবশেষে তিনি মুলতানের সন্নিকটে কাহিনওয়াল নামক স্থানের আজুদহনকে নিজের আবাসস্থল হিসেবে গ্রহণ করেন।
দিল্লির সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে শায়খুল কবিরের সাক্ষাতে আজুদহনে উপস্থিত হোন। সুলতান নাসিরুদ্দিনের উজিরে আজম গিয়াসুদ্দীন বলবনও শায়খের সাথে আধ্যাতিক সুসম্পর্ক রাখতেন। (সিয়ারুল আওলিয়া,৭৯)
দিল্লির সাম্রাজ্য লাভকে তিনি শায়খের দোয়া ও আন্তরিক ভালোবাসার কারণ মনে করতেন। শায়খ ফরিদুদ্দীন চিশতিয়া সিলসিলা ছাড়াও সমসাময়িক অন্যান্য সিলসিলার কামিল বুজুর্গদের বন্ধুত্ব ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন। সোহরাওয়ার্দী তরিকার মুজাদ্দিদ ও মুর্শিদ শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া মুলতানীর সাথেও তার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি তাকে শায়খুল ইসলাম বলে সম্বোধন করতেন।
শায়খুল কবিরের সারা জীবনের নীতি ছিল ধনী,ক্ষমতাসীন ও রাজদরবার হতে দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিজের অবস্থা গোপন রেখে দরবেশী জীবনযাপন করা। আল্লাহর ভয়ে তিনি অবিরাম কাঁদতেন। সিয়াম পালন,কোরআন হিফজ ও তিলাওয়াতে খুব আগ্রহী ছিলেন এবং ভক্ত মুরিদানদের তাকিদ দিতেন। ইন্তিকালের পূর্বে তিনি আবার অভাব-অনটনে পড়েন এমনকি ঘরে ঠিকমতো চুলা জ্বলত না।
শায়খুল কবিরের পাঁচজন খলিফা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন- শায়খ জামালুদ্দীন হাসুবী,শায়খ বদরুদ্দীন ইসহাক, শায়খ আরিফ,শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়া ও শায়খ আলী আহমদ সাবির পীরানে কালিরী। শেষের দুইজনের মাধ্যমে শায়খের সিলসিলা ভারতবর্ষ ও বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
মৃত্যুর পর শায়খের পুত্র বদরুদ্দীন সুলায়মান পিতার স্থালাভিষিক্ত হোন। আর শায়খুল কবিরের খিরকা, লাঠি ও পাগড়ি শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়াকে দান করে যান। ৫ মুহররম ৬৬৪ হিজরিতে শায়খুল কবির ইন্তেকাল করেন।



