সর্বশেষ সংবাদ

রাজনীতি গণতন্ত্র ও শিশুর ভাবনা

মাসুম বিল্লাহঃ একটি গাড়ি চালানোর জন্য যেমন ভাল মানের ইঞ্জিন প্রয়োজন। আর ইঞ্জিনকে ভাল রাখার জন্য ভাল মানের জ্বালানী ব্যবহার করতে হবে তেল মবিল । ঠিক তেমনি একটি স্বাধীন দেশ চালাতে গেলেও একটি সুষ্টু সবল রাষ্ট্রযন্ত্র প্রয়োজন হয়।আর রাষ্ট্রযন্ত্র’কে ভাল রাখতে হলে, অবশ্যই সঠিক গঠনতন্ত্রের চর্চা করতে হবে।

সুষ্ঠ গণতন্ত্র ছাড়া কখনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়।বরং রাজনৈতিক সংকট বিরাজমান থাকবে।আর রাজনৈতিক সংকটে’র উপর ভর করে এক শ্রেণীর মানুষ হয়ে উঠবে সহিংস, হারিয়ে ফেলবে তার মনুষত্ব্য, হারিয়ে ফেলবে তার নৈতিকতা। নেতারা ছড়াবে মিঠায় মন্ডা, কেউ চড়বে হুন্ডা,কেউ হয়ে উঠবে গুন্ডা। কিন্তু আমরা কী কেউ কখনও ভেবে দেখেছি এগুলো আমাদের শিশুদের জন্য কতটা বিপদ জনক।

শিশুদের মুক্তচিন্তা বিকাশের অন্তরাই।আমরা বড়োরা যে কাজ করি তা দেখে শিশুরা শেখে।আমরা যদি সুষ্ঠ গঠনতন্ত্রর চর্চা করি তাহলে আমাদের শিশুরাও সুষ্ঠ গঠনতন্ত্রে’র চর্চা করবে।শুধু তাই নয় তাদের নৈতিকতারও অবক্ষয় ঘটা হ্রাস পাবে। সবাই যদি পন্ডিত হই তাহলে শিশুরা শিখবে কার কাছ থেকে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া যা ঘটছে তাতে অনেক শিশু মন পড়াশোনা ও খেলা ধুলার চেয়ে কূট রাজনীতি ভালভাবে রপ্ত করে ফেলছে।আমরা কী আমাদের শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছি?জ্ঞান শিখাচ্ছি?নাকি রাজনীতি শিখাচ্ছি।নাকি কৌশলে রাজনীতি শিখাচ্ছি।

ভাবছেন কলাম লিখতে যেয়ে আমি কি সব পরিচিতি কথা লিখছি?কিন্তু গভীর ভাবে চিন্তা করুন।বা ধরুন কোন একটি ভালো সিরিয়াল (নাটকের) দর্শক তার প্রিয় অভিনেত্রীর পরিহিত স্টাইলের শাড়ি, ব্লাউজ, জুতা, হেয়ার স্টাইল, ইত্যাদি অনুসরণ করে থাকে।প্রমাণ সরুপ সাম্প্রতিক কালে আপনারা দেখেছেন পাখি শাড়ির জন্য অনেকে স্বামী সংসার ছেড়েছেন,অনেকে সুইসাইট পর্যন্ত করেছে।

ঠিক তেমনি বিগত দিনে আমরা দেখেছি কোন রাজনৈতিক নেতার আগমনে একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাস্তার ধারে দাড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।তারা শ্লোগান দিচ্ছে। ফুলের শুভেচ্ছা দিচ্ছে। ঠিক এখান থেকে অনেকের রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ।ওই পাখি শাড়ির মত। লেখাপড়া আন্ডার প্রাইমারি। আস্তে আস্তে নেতা। একবার ভাবুন এরকম নেতারা আপনার জন্য সংসদে কী আইন পাস করবে।আপনার নগর পিতা হয়ে এলাকার কী সেবা করবে?

যদিও শিশুদের রাজনৈতিক অভ্যার্থনা না যানাতে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট সোচ্ছার।এবং তার দলের নেতাকর্মী ও সু-শিক্ষিত। আমি নতুনদের রাজনিতি করতে নিষেধ করছিনা। অবশ্যই নতুনদের রান্না করার সুযোগ দিতে হবে।নতুনরাও রান্না করবে, ভালো রান্না করবে। তাই বলে ছুচোর মাংস রান্না করবে তাতো হয়না, মানা যায়না। আমি শুধু শিক্ষাঙ্গন থেকে রাজনীতি! বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের রাজনীতি থেকে বিরত রেখে বিজ্ঞান মনস্ক, সৃজনশীল প্রতিভার উৎসহ করার কথা বলছি এটায় স্রেয়। এবং সঠিক গণতন্ত্রের চর্চার শিক্ষাও দিতে হবে লেখাপড়ার পাশাপাশি। একটি বাস্তব গল্প বলি।

আমি একটি প্রাইভেট স্কুলে সার্ভিস দিচ্ছিলাম। আমি ৫ম শ্রেণীর বিজ্ঞান ক্লাস নিয়ে থাকি। সেদিন হঠাৎ ব্যক্তিগত কারনে ৫ম শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে’র শিক্ষক আসেনি শিক্ষার্থীরা দারুন হৈচৈ করছে।আমার তখন অফ পিরিয়ড, তো নীতিগত কারণে আমি ক্লাসে গেলাম।জানতে চাইলাম তোমাদের এখন কোন ক্লাস। একজন শিক্ষার্থী বলল বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় আমি বইটা খুলে বললাম আজ পড়াব গণতন্ত্র চর্চা।

এক শিক্ষার্থী বলল স্যার সেটা কী?আমি বললাম, তোমরা যে শিক্ষক আসার আগে হৈহুল্লাহ করছ তোমাদের ক্লাসে কি কোন ক্যাপ্টেন নেই।আচ্ছা তোমাদের ব্যবহারিক দেখাব গনতন্ত্র। এব্যপারে তোমরা সবাই আমাকে সাহায্য করবে।একপর্যায় আমি বল্লাম এখন নির্বাচন হবে।তোমরা কে কে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক তারা উঠে দাড়াও।৫-৬জন প্রার্থী দাড়াল। আমি প্রথম বেঞ্চের এক ছেলেকে বল্লাম তুমি এ নির্বাচনের প্রিজায়ডিং অফিসার হবে।এভাবে দায়িক্ত ভাগ করে নামের লিস্ট করছি । এরমধ্য দ্বিতীয় বেঞ্চ থেকে একজন শিক্ষার্থী উঠে বল্ল স্যার আমার নাম লিখেছেন! আমি কিন্তু ভোট কাটব।কথা শেষ নাহতেই আর একজন শিক্ষার্থী হাত তুলে উঠে দাড়িয়ে বলছে স্যার আমি কিন্তু ভোম মারব!!তাহলে চিন্তা করেন কী শিখছে আমদের দেখে আমাদের শিশুরা। কোথায় যাচ্ছে কিশোর মনের ভাবনা। আমি অবাক হলাম এতটুকু শিশু এসব বলছে কী? আমি শিক্ষক হয়েও ওদের কথার কোন উত্তর দিতে পাচ্ছিনা।আমি জানি ওদের(শিশুদের) কাছে কোন ভোট নাই। ভোটকাটার শক্তি নাই।

আমার গনতন্ত্র শেখানোর আগে ওরা সিনেমা-নাটকে, বা মাঠে-ময়দানে যা দেখেছে এ কথা গুলো তারই প্রতিফলন।শিশুদের এহন বাগবিতণ্ড আচারনের জন্য দায়ী কারা? আমরা দায়ী,আমাদের দেশের রাজনিতি, আমাদের মিডিয়া,আমাদের (বড়দের) সুষ্ঠ গনতন্ত্র চর্চা নাকরা। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের শিশুদের মনে,চিন্তায়, এধরনের গনতন্ত্র চর্চা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।তাহলে আমাদের শিশুদের, ভাবনা ও চেতনার চৈতন্য ঘটবে। এ ব্যপারে আমাদের মিডিয়া গুলোকে আরও একটু সচেতন হতে হবে।এবার আসুন ফিরে তাকায় মহান সংসদের দিকে। যেখানে আইন পাস হয়। যে সংসদের প্রতি শুধু শিশুরা নয় বড়দেরও রয়েছে পরম শ্রদ্ধা।কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এ সংসদ ভবন থেকে শোনা গেল অকথ্য ভাষা। এ সংসদ ও আমাদের লজ্বা দিয়েছে।

আবাও একটু গল্প বলি। আমার ছোট ভাই সবসময় টেলিভিশনে কার্টুন চিত্র দেখে মটু-পাটলু ইত্যাদি।

আমি তাকে পরামর্শ দিলাম টেলিভিশনে এমন কিছু দেখ যার মাধ্যমে তোমার জ্ঞানের উন্মেস ঘটে।তুমি বিতর্ক অনুষ্ঠান দেখ, বিটিভি দেখ, জাতীয় সংসদের অধীবেসন দেখ, দেশ সম্পর্কে জান,এবং নিজে যুক্তিবাদি হয়ে গড়ে ওঠ।জ্ঞানী হয়ে গড়ে ওঠ।ছোটভাই আমার কথামত সেদিন প্রথম বিটিভিতে জাতীয় সংসদের অধীবেসন দেখছে। হটাৎ একজন সিনিয়র মহিলা সংসদ সদস্য (চুদুরবুদুর……..)অশোভন ভাষায় আলোচনা করতে লাগল।এনিয়ে দেশে অনেক প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল। ওই শিশুটি কি শিখল সংসদ দেখে।সে কতটুকু যুক্তিবাদি হিসাবে গড়ে তুলতে পেরছে নিজেকে?সে কতটুকু জ্ঞানী হতে পেরেছে সংসদ দেখে?

আর আমি কতটা লজ্বা পেয়েছি পরামর্শ দিয়ে এবার আসুন ভিন্নক থায়।

পথশিশু বা বস্তির শিশুদের ব্যবহার করছে নানা চক্র কখনো রাজনৈতিক নেতা, কখনো স্বার্থনেশী মহল। তারা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এধরনের শিশুদের দিয়ে সরকারের সম্পত্তিতে অগ্নীসংযোগ সহ নানা ধরনের অপরাধ করিয়ে থাকে।এমনকি শিশু অধিকার লঙ্ঘন করে।এরা বড় বড় মামলারও সম্মুখিন ও হয়।এই পিছিয়ে পড়া শিশুরা আরও পিছিয়ে যায়।বন্ধ হয়ে যায় বড় হওয়ার পথ।

শিশুর উন্মুক্ত ভাবনা’র অন্তরায় কারা?আমাদের সমাজের এক শ্রেণীর পাতি নেতারা যারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য শিশুদের ব্যবহার করছে। কখনো মাধ্যমিক স্তরের মেধাবি মুখগুলোকে রঙ্গীন ফেস্টুনে’র ফ্রেমে বাধিয়ে চুনেনেতারা ছাত্রদের তাদের চুচিয়া বানিয়ে ফেলছে।এব্যাপারে সচেতন হতে হবে অভিবাহকদের,পিতা-মাতার।মনে রাখতে হবে শিশু মন আবেগে চলে।আমি আবারও বলছি নতুনেরা নেত্রিত্ব দেবে, রাজনিতি

করবে।তার আগে তাকে মানুষ হতে হবে।লেখাপড়া করতে হবে।জ্ঞাণী হতে হবে,জীবন ও জগত সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর তারা নেতৃত্ব/রাজনীতি করবে।পরিশেষে বলতে চাই আসুন আমরা যার যার অবস্থান থেকে শিশুদের নতুন করে স্বপ্ন দেখায়।তাদের ভাবনাকে উন্মুক্ত করি। আমরা শিশুদের রাজনীতি’র হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার না করে তাদের লেখাপড়া করতে সাহযগীতা করি।এবং আমরা নিজেরা ও নেতারা সঠিক গনতন্ত্রের চর্চা করি। তবেই আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যত নয়,সম্পদ হয়ে গড়ে উঠবে।

লেখকঃ মাসুম বিল্লাহ,ডি কৃষিবিদ ও সংগঠক

error: লাল সবুজের কথা !!