যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি নাগরিকরা কতটা নিরাপদ?

285

মো. সাখাওয়াত হোসেন 

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে ১৮ জুলাই রাত সাড়ে ৩টায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের রমিম উদ্দিন আহমেদ নামের এক তরুণ নিহত হয়েছেন। সন্ত্রাসীরা তার সঙ্গে থাকা গাড়ি ও টাকা ছিনতাইয়ের জন্য মাথায় গুলি করে বলে জানা গেছে। প্রকৃত অর্থে এ মর্মান্তিক বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো মানেই হয় না, কেননা কিছুদিন পরপর বাংলাদেশিরা খুন হচ্ছে আমেরিকাতে। কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থামছেই না। তাছাড়া, হত্যাকাণ্ডের সব ঘটনা মিডিয়াতে না আসায়, প্রকৃত সংখ্যা উঠে না আসায়, আমেরিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুরবস্থার প্রকৃত চিত্র উপস্থাপিত হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নভাবে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে, এক অর্থ এমন; যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশের নাগরিক নিহত হওয়ায় তাদের আত্মীয়স্বজনের বদৌলতে সংবাদগুলো এ দেশের পত্রিকায় আসছে; কিন্তু অন্য দেশের নাগরিকদের নিহতের ঘটনা এ দেশের মিডিয়াতে তেমন আসছে না। কাজেই বিদেশি নাগরিকরা আমেরিকাতে কতটুকু নিরাপত্তা হুমকিতে রয়েছে, তার প্রকৃত পরিসংখ্যান জানা থেকে সবাই বঞ্চিত হচ্ছে। তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, বিদেশি নাগরিকদের জন্য আমেরিকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, নিহত রমিম স্থানীয় একটি কলেজে কম্পিউটার সায়েন্সের ওপর পড়ালেখা করার পাশাপাশি মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইস শহরের হ্যাম্পটন এভের ১১০০ ব্লকের একটি গ্যাস স্টেশনে চাকরি করতেন। একদল সন্ত্রাসী তার সঙ্গে থাকা গাড়ি ও টাকার জন্য তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসীদের বিচরণ এখন দৃশ্যমান। এ কথা সহজেই অনুমেয় রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হওয়ায় একের পর এক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু এ ধরনের ঘটনা একেবারে নতুন নয়, কিছুদিন পরপর এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও লোমহর্ষক ঘটনার অবতারণা হচ্ছে দেশটিতে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ ও সামর্থ্যরে ব্যাপারে অনেকের প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রতিটি রাষ্ট্রই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। হলি আর্টিজানের হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক একটি চক্র তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকার করে, সে জায়গাতেও বাংলাদেশ সরকার ত্বরিত গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদেশিদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে; কিন্তু আমেরিকাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে হামলাগুলো হচ্ছে, হামলাতে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততাই পাওয়া যাচ্ছে। সে জায়গায় আমেরিকা কেন, কী জন্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে; এ বিষয়টি উদঘাটন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

খবরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি নির্বিচারে বন্দুক হামলা হয়েছে। হামলায় মৃত্যু হয়েছে ১৪০ জনের। ২০০৬ সালের পর গত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বন্দুক হামলা হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে বাড়িতে ঢুকে, বড় ও ছোট শহরে নির্বিচারে বন্দুক হামলায় মৃত্যুর ঘটনা থামছেই না। অর্থাৎ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বাহিনী ব্যর্থ হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রটি যখন তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রটির মধ্যে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার সৃষ্টি হয়। এক কথায় যাকে বলা হয়, ব্যর্থ রাষ্ট্রে। তবে আমরা প্রত্যাশা করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা উত্তরণে আমেরিকার সরকার যুগোপযোগী ভূমিকা রাখতে উদ্যোগী হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় প্রতি সপ্তাহে কোথাও না কোথাও বন্দুক হামলা হয়েছে। গত ২৭ মার্চ টেনেসি অঙ্গরাজ্যের নাশভিল শহরে একটি বেসরকারি স্কুলে বন্দুক হামলা হয়। এসব ঘটনা কিন্তু আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি বেড়েছে এবং উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ নাগরিকদের। আমেরিকা যেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানবাধিকার, নিরাপত্তা, নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রগুলোকে দীক্ষা প্রদান করে, সে জায়গায় আমেরিকাতে নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, ব্যাপারটি কিন্তু গবেষকদের আলোচনায় নতুন বিষয়ের আবির্ভাব ঘটাবে। আমরা যদি রাজনীতি বিজ্ঞানের স্টেট সেন্টার্ড তত্ত্বকে সামনে নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করি তাহলে দেখা যায়, রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান এবং রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কেউ অপরাধ করলে রাষ্ট্র যেমনভাবে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে, ঠিক তেমনিভাবে রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিক সমান গুরুত্ব বহন করে। এখন রাষ্ট্র হিসাবে আমেরিকা কি এ ধ্যানধারণা থেকে সরে এসেছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। অন্যদিকে ইঙ্গিত করলে দেখা যায়, আমেরিকা নিজ দেশের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে ভিন্ন দেশের প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়ায় আমেরিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে।

তবে আমরা মনে করি, আমেরিকা যেভাবে অন্য দেশের ব্যাপারে মনোযোগ দিয়েছে, ঠিক সেভাবে না হলেও কিছুটা হলেও নিজের দেশের নাগরিকদের ব্যাপারে দৃষ্টি প্রদান করা উচিত। গ্রামের মুরব্বিরা বলে থাকেন, নিজের ঘর ঠিক না করে অন্যের ঘরের দিকে নজর দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতি আমেরিকার বিশেষ নজরের বিষয়ে সবাই অবগত, তাছাড়া বিশ্বরাজনীতিতে অন্যান্য ইস্যুতেও আমেরিকা প্রবল সোচ্চার। সে কারণেই হয়তো নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমেরিকা উদাসীন। না হলে একটার পর একটা হত্যার ঘটনা, সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনা আমেরিকাতে ঘটার কথা নয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলতে যা বোঝায়, সে রকম ঘটনাই কিন্তু আমেরিকাতে ডাল-ভাতের মতো ঘটছে; যা কোনোভাবেই একটি সভ্য দেশের পরিচায়ক হতে পারে না।

পাঁচ বছর ধরে নির্বিচারে বন্দুক হামলার হিসাব রাখার কাজে নিযুক্ত রয়েছেন নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অপরাধবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেমস অ্যালান। তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিন এটি বলেই অভ্যস্ত হয়েছি যে, বছরে দুই থেকে তিন ডজন হামলা হয়। কিন্তু এবার ছয় মাসেই ২৮টি হামলা হয়েছে।’ বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বড় রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। ডেমোক্রেটরা আরও কঠিন আইন করার পক্ষে। কিন্তু রিপাবলিকানরা এর বিরোধিতায় সরব। দলটির ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী বন্দুকের মালিক হওয়া ‘প্রশ্নাতীত একটি বিষয়’।

অপরাধবিজ্ঞানী গিলিনের মতে, বিযুক্তি প্রক্রিয়া অপরাধকে ত্বরান্বিত করে। বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকানদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বিযুক্ত প্রক্রিয়ারই অংশস্বরূপ। নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী আচরণের কারণেই মূলত বিযুক্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সমাজ বিভিন্ন দল, গ্রুপ ও উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং সমাজের ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠীর প্রবর্তিত নিয়মকানুনের বিরোধিতা করে অন্য পক্ষটি। সে কারণেই সমাজে দেখা দেয় বিভেদ, সংঘাত ও অস্ত্রের ঝনঝনানি। আমেরিকার সমাজব্যবস্থায় বর্তমান সময়ে এ ধরনের চিত্র-প্রতিচিত্রের ঘটনা অহরহ ঘটছে।

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তৃতায় বলেছেন, আমেরিকার উচিত হবে নিজ দেশের প্রতি মনোযোগী হওয়া। অন্য দেশের যুদ্ধ কর্মকাণ্ডে খরচ না করে নিজ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা উচিত। আমেরিকায় বাচ্চাদের স্কুলে সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ মন্তব্যটি করেন। আমেরিকার বর্তমান প্রশাসনের নীতি ও পরিচালনা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে। শুধু তাই নয়, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নাক না গলিয়ে নিজ দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত আমেরিকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক আমেরিকাতে নিখোঁজ, এ বিষয়ে জাতিসংঘ, ইইউ বিবৃতি প্রদান করুক।

আমেরিকার উচিত হবে প্রত্যেক নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিতে জোরালোভাবে কাজ করা। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনে বাজেট বর্ধিত করা, নাগরিকরা যেন তাদের জানমাল ও সম্পদকে নিরাপদে রাখতে পারে সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ঐকান্তিক দায়িত্ব। আমেরিকা নিজ দেশের নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে; পরিসংখ্যান অন্তত তাই সাক্ষ্য দেয়। তাছাড়া আরও যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে, তা হচ্ছে বিদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, না হলে তাদের ইমেজ বিশ্বব্যাপী ক্রমান্বয়ে ক্ষুণ্ন হবে এবং তাই হচ্ছে।

মো. সাখাওয়াত হোসেন : চেয়ারম্যান, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়