যাত্রা শুরু হয়েছিলো ২১ থেকে !

মোঃ জাবের হোসেনঃ আজ মহান মার্তৃভাষা দিবস । বায়ান্নর ৬৭ তম দিনে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে চাই সেই সকল বীরদের । যাদের রক্তে গাঁথা আমাদের ভাষা, যাদের রক্তে গাঁথা আমাদের স্বাধীনতা । কবির ভাষায় “ স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন” । বঙ্গীয় সমাজে বাংলা ভাষা নিয়ে ভাষাচেতনার উন্মেষ ঘটে , তারই সূত্রে ঢাকায় ৪৭ সালের শেষে ভাষা বিক্ষোভ শুরু হয়। যার চরম প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালে। ভাষার জন্য আজকের এই দিনে প্রাণ দিয়েছিলেন বরকত, সালাম, রফিক , শফিক সহ নাম না জানা আরো অনেকে।

মূলত বায়ান্ন সালের আজকের এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বেরিয়ে আসে। এরপর শুরু হয় পুলিশের বর্বরতা। গুলি বর্ষণ শুরু করে। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে সবাই সমাবেত হয়। এরপর শুরু হয় সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ। এতে যোগদান করতে থাকে সাধারণ মানুষেরা।

পরদিন থেকে শুরু হয় রাজপথে আন্দোলন। প্রথমেই ঢকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গনে গায়েবি জানাজা নামাজ শেষে শুরু করে কর্মসূচি। ২১ তারিখে নিহত শদীদরে স্মরণে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে গড়ে তোলে স্মৃতিস্তম্ভ। কিন্তু ২৬ তারিখে সেটি সরকার গুড়িয়ে দেয়। তবে এরই মধ্যে ভাষা আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

১৯৫৪ সালে প্রদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে, মে মাসে বাংলা ভাষাকে পাকিস্থানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়া হয়। তখন থেকে এ দিবসটি শোক দিবস হিসাবে পালিত হতে থাকে।

মূলত স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়েছিলো সাতচল্লিশ সালের দেশ ভাগের সময়ের পর থেকে । ১৯৪৭ সালের দি¦-জাতিত্ত্বের ভিত্তিতে । এর উপর ভিত্তি করে পাকিস্থান অধিরাজ্য ও ভারত অধিরাজ্য নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর মধ্যে পাকিস্থানের যে অংশটি ছিলো সেটি দুই ভাগে বিভক্ত ছিলো। যার একটি নাম ছিলো পূর্ব বাংলা অপরটি ছিলো পশ্চিম পাকিস্থান ।

যার মধ্যে দূরত্ব ছিলো প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। এজন্য দুটি অংশের মধ্যে সাংস্কৃতিক , ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেক মৌলিক ব্যবধান বিরাজমান ছিলো।

এজন্য ১৯৪৮ সালে পাকিস্থান ঘোষণা করে কেবল উর্দুই হবে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় অবস্থানকারী জনগন ক্ষেপে ওঠে। মনের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। কারণ তারা এ অন্যায় মেনে নিতে পারেনি। যার ফলস্বরুপ ভাষার সমান দাবিতে পূর্ব বাংলায় সম-মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত দাবি মানতে বাধ্য হয় সরকার।

১৯৫৩ সাল থেকে প্রতি বছর উদ্যাপিত হচ্ছে ২১ শে ফেব্রুয়ারি। পৃথীবির ইতিহাসে কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে সেটি বাঙালিরা করে দেখিয়েছে সেদিন। আজকে সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রত্যুষে সর্বস্তরের মানুষেরা খালি পায়ে প্রভাতফেরীতে অংশগ্রহণ করে। শহীদদের জন্য শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবে। দিবসটি ২০০১ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে ১৯৭১ সালে। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ শেষ করে , ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা অর্জন করে । কিন্তু এই স্বাধীনতার বীজ রেপিত হয়েছিলো আরো অনেক আগেই । ধরা যায় সেই বীজ রোপিত হয়েছিলো আজকের এই দিনে। কারণ ভাষার জন্য যখন বাঙালিরা জীবন দিয়ে নিজেদের মুখের ভাষা ফিরিয়ে আনতে পারলো তখন চিন্তা করতে লাগলো নিজেদের স্বাধীনতার কথা । আর সেই থেকে সূত্রপাত স্বাধীনতার। এরপর একে এক চুয়ান্ন, ছাপ্পান্, আটান্ন, উনষাট,বাষট্টি, চৌষট্টি, ছেষট্টি, আটষট্টি,উনসত্তর, সত্তর শেষে একাত্তর।

আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদেরকে শিখিয়ে গেঁছেন কীভাবে দেশের জন্য কাজ করবো, কীভাবে দেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে। কিন্তু পূর্ব-পুরুষদের সেই নির্দেশিত পথে আমরা কতটুকু চলছি বা চলার জন্য চেষ্ঠা করছি সেটাই আমাদের প্রচেষ্টা। বর্তমান প্রজন্ম আজকের এই দিন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যদি কিছু উপহার দিতে না পারে তাহলে জাতীয় আশা-আকাঙ্খার ব্যর্থ প্রতিফলন উন্মেষিত হবে।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক,লাল সবুজের কথা

error: লাল সবুজের কথা !!