মুজুরী বৈষম্যের স্বীকার মান্দার নারী শ্রমিকরা

36

মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ প্রতিনিধি : আন্তর্জাতিক নারী দিবস কাকে বলে ? জানা নেই মান্দার স্বামী পরিত্যাক্তা সেলিনা বেগমের। গত ৮ বছর আগে স্বামী ছেড়ে দেয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন মৈনম ইউপির দূর্গাপুর গ্রামের গরীব অসহায় বাবার বাড়ীতে। গ্রামের বিভিন্ন জনের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে কষ্টে কোন রকম দিন পার করতেন।

গত ৩ বছর আগে সেকেন্দার আলীর চুলের কারখানায় মাসে ১৫শ’ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এ কারখানায় কাজ করতে হয়। এ কারখানায় কাজ করে এখন টিনের দুই ঘর দিয়েছেন সেলিনা বেগম। সেইসাথে হাঁস-মুরগির পাশাপাশি পালন করছেন এবং দুইটা ছাগল আছে তার । আগের চেয়ে অনেক ভাল আছেন। তবে চুল বাছাইয়ের কাজে মুজুরী বৈষম্যের স্বীকার হয়ে থাকেন এবং সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকেও অনেকটা বঞ্চিতবলে অভিযোগ রয়েছে তাদের। কিন্তু কোন কাজ না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই এ পেশায় কাজ করেন তারা।

নওগাঁর মান্দা উপজেলার দূর্গাপুর গ্রামে নিজ বাড়ীসহ তিনটি গ্রামে ৫টি চুল প্রক্রিয়াকরণ কারখানা করে প্রায় তিন শতাধিক হতদরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছেন সেকেন্দার আলী। শুধু হতদরিদ্র নারী নয়, কাজ করছেন শিক্ষার্থীরাও। এ কারখানায় কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক দরিদ্র মহিলা। এ কারখানার শুরু থেকে কাজ করছেন মাহফুজা বেগম।

তিনি বলেন, অভাবী সংসার। চারজন সদস্য। স্বামী অসুস্থ, শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। ছেলে রাজশাহীতে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করে। এখানে কাজ করে যে টাকা পান তা ছেলের কাছে পাঠান। ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করার লক্ষ্যে কষ্টে করে চুলের কারখানায় কাজ করছেন। এখানে কাজ না করলে হয়তো ছেলেকে রাজশাহীতে পড়ানো সম্ভব হতো না।

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হতদরিদ্র নারীরা অপরিস্কার ও জটলা বাধা চুল এ কারখানায় পরিস্কার করেন। সাংসারিক কাজ শেষ করে আসেন কারখানায়।

অনেকে মাস ভিত্তিক আবার অনেকে দিন হিসেবে কাজ করেন। আর এ থেকে প্রাপ্ত আয় তাদের সংসারে কাজে লাগান। আবার অনেকে নিজেদের সৌখিন কাজে ব্যবহার করেন। সংসারে অভাব থাকায় দুই বছর আগে মনঞ্জুআরা বেগম কারখানায় কাজ শুরু করেন। স্বামী ভ্যান চালক। এখানে কাজ করে গত বছর ২৩ হাজার টাকায় ১০ কাঠা জমি বন্ধন নিয়েছেন। এছাড়া হাতের সোনার বালা ও কানের দুল নিয়েছেন। যা ভ্যান চালিয়ে স্বামীর পক্ষে হয়তো সম্ভব হতোনা বলে জানান।

১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জান্নাতুন ও ৮ম শ্রেণীর রিপা বলে, শুক্রবার ও ছুটির দিনগুলোতে কারখানায় কাজ করা হয়। এ টাকা দিয়ে তাদের কসমেটিক সামগ্রী, লেখাপড়ার খরচ ও ছোটখাটো কাজে ব্যায় করা। এ কারখানায় কাজ করছেন সামিরন, রওশন আরা, মরিয়মসহ ৪৫জন নারী শ্রমিক। সবারই সংসারে এসেছে স্বচ্ছলতা।

কারাখানার মালিক সেকেন্দার আলী বলেন, ২০১৩ সালে প্রথমে ১টি কারখানা দিয়ে শুরু করলেও এখন ৫টি কারখানা দিয়েছেন। ৫টি কারখানায় প্রায় তিন শতাধিক হতদরিদ্র নারী শ্রমিক রয়েছে। প্রতিজন শ্রমিকের বেতন মাসে ১৫শ’ টাকা। অনেক নারীরা স্বামীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে পায়না। এ নিয়ে ঝগড়া হয়। গ্রামের যারা হতদরিদ্র নারী আছে তাদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টির জন্য এ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে ৫০-৬০ কেজি চুল নিয়ে আসতে হয়। প্রতিদিন প্রতিটি কারখানায় ১০ কেজি করে চুলের প্রয়োজন হয়। প্রতিকেজি ৪ হাজার টাকা দরে কিনে কারখানায় চুলের জট ছাড়িয়ে পরিস্কার, শ্যাম্পু ও শোধনের পর ৭-৮ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।

তিনি আরো বলেন, জমিজমা নেই। নিজে পায়ে দাঁড়ানোর জন্যই এ পেশা। ব্যাংক থেকে কোন ঋণ না পাওয়ায় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে টাকা তুলে এ ব্যবসা শুরু করেন। এখনও প্রায় লক্ষাধিক টাকা ঋণের মধ্যে আছেন। তবে আগামীতে এব্যাবসার মাধ্যমে নিজে আর্থিভাবে সফলতা অর্জন করতে পারলে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক কিছুটা হলেও বাড়ানো সম্ভব হবে।