বিশ্বসেরা ভবনের পুরস্কার পেলো শ্যামনগরের ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল

161
চমৎকার পরিবেশে স্থাপত্যশৈলি এবং নান্দনিকতার জন্য যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইন্সটিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট- রিবা অ্যাওয়ার্ড জিতলো শ্যামনগরের ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। ছবি - লাল সবুজের কথা।
চমৎকার পরিবেশে স্থাপত্যশৈলি এবং নান্দনিকতার জন্য যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইন্সটিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট- রিবা অ্যাওয়ার্ড জিতলো শ্যামনগরের ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। ছবি - লাল সবুজের কথা।

মো. জাবের হোসেন : চমৎকার পরিবেশে স্থাপত্যশৈলি এবং নান্দনিকতার জন্য যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইন্সটিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট- রিবা অ্যাওয়ার্ড জিতলো শ্যামনগরের ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। 

বুধবার (২৬ জানুয়ারি) শ্যামনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালকে ২০২১ সালের রিবা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক এ স্থাপত্য সংস্থাটি। এর আগে ২০২১ সালে রিবা অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পায় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। দৃষ্টিনন্দন হাসপাতালটির ডিজাইন করেছেন বিশিষ্ট স্থপতি কাশেফ চৌধুরী। তার প্রতিষ্ঠান আরবানা’র অধীনে তৈরি নকশা অনুসারে নির্মিত হয়েছে শ্যামনগরের ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল।

প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা সাতক্ষীরার মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবায় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে শ্যামনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। শ্যামনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। আর নির্মাণকাজ শেষে এর কার্যক্রম শুরু ২০১৮ সালের ২২ জুলাই মাসে।
আরো জানা গেছে, বিশ্বের ১১টি দেশের মধ্যে ১৬টি ব্যতিক্রমী নতুন স্থাপনা থেকে বাছাই করে এই হাসপাতালকে রিবা আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে পাঁচ সদস্যের জুরি বোর্ড। জুরি বোর্ড বলছে, সাতক্ষীরার ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দক্ষিণ বাংলার জলো পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে।
হাসপাতালটির বিশেষত্ব হলো, স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে ভবনটি গড়ে তোলা হয়েছে৷ এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে প্রচুর আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে। বিদ্যুতের সর্বনিম্ন ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। জল সংরক্ষণের জন্য জলাধার রাখা হয়েছে। হাসপাতালের নিরাপত্তা, সহজে যাতায়াত ব্যবস্থাও সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল যে, হাসপাতালের সব সুবিধা থাকতে হবে৷ কিন্তু বাজেট খুবই কম ছিল। এই হাসাপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, কম বাজেটের মধ্যে স্থানীয় উপাদান ও হাতে তৈরি ইট ব্যবহার করা হয়েছে। শ্রমিকরাও স্থানীয়।”
হাসপাতালের ইনডোর এবং আউটডোর দুটি আলাদা জায়গা। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুই রকম। ১০ ফুট চওড়া জলাধারের মাধ্যমে ইনডোর এবং আউটডোর আলাদা করা হয়েছে। পুরো হাসপাতালে বৃষ্টির জল ধরে রাখতে জলাধার নির্মাণ করা হয়েছে৷ অতিরিক্ত জল সামনের পুকুরে যায়। হাওয়া বাতাস চলাচল করতে পারে এমন ভাবেই ওয়ার্ডগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।
ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের সহকারী ব্যবস্থাপক অসীম ক্রিস্টোফার রোজারিও বলেন, “হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা দেওয়া হয়। তিনটি অপারেশন থিয়েটার, নারী-পুরুষের ওয়ার্ড, একটি লেবার ওটি রয়েছে। নিউনেটাল কেয়ার ইউনিটে ইনকিউবেটর সুবিধাসহ নবজাতকদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়াও, বহির্বিভাগে চক্ষু, দন্ত, ফিজিওথেরাপি ইউনিট, পেইন সেন্টার, গাইনি, সার্জারি ইউনিট, সার্ভিক্যাল ক্যান্সার ও ট্রিটমেন্ট সেন্টার রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আধুনিক ল্যাবও রয়েছে৷ আউটডোরে চিকিৎসকের ফি মাত্র ১০০ টাকা। আর ৩০০ টাকায় বিশেষজ্ঞ কনসালটেন্ট দেখানো যায়। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭২ হাজার মানুষ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা পেয়েছেন।”

ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক রুনা খান বলেন, শ্যামনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল রিবা অ্যাওয়ার্ড জয় করায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, “সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাবিত লবণাক্ত এলাকায় অবস্থিত এ হাসপাতাল নির্মাণ করেছে উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা’ফ্রেন্ডশিপ’।  ২০ বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাবিত স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আমরা কাজ করে দেখেছি এবং এতে আমার বিশ্বাস হয়েছে যে,নিজেদের ছোট ছোট সমাধানেও দরিদ্র মানুষকে বেগ পেতে হয়। কাশেফ চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। তিনি এমনই এক ব্যক্তি, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। গুনগত মান নিশ্চিত করেছেন এবং ফ্রেন্ডশিপের মান-সম্মানকে আরও বাড়িয়েছেন। আমাদের জন্য তিনি সত্যিই এমন এক স্থপতি, যিনি নিজের মনে করে যত্নের সাথে ডিজাইনকরে আমাদেরকে সরবরাহ করেছেন। পর্যাপ্ত আলো, বাতাস, মাটি, পানির সমন্বিতপরিবেশে শ্যামনগরের ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের সৌন্দর্য হয়ে উঠেছে আরও জীবন্ত।জলবায়ু প্রভাবিত কিছু মানুষের জন্য এই ধরণিতে নতুন করে এবং ভালোভাবে বাঁচার আশা নিয়ে এসেছে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল।
৬ জন চিকিৎসক, ১২জন নার্স এবং অন্যান্য সহকারীর সমন্বয়ে ২০ বেডের হাসপাতালে রয়েছে ৪টি ওয়ার্ড। ৩টি অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে বেশিরভাগ অস্ত্রপচার হচ্ছে এখানে। প্রত্যন্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ এবং অ্যাম্বুলেন্স সুবিধায় হাসপাতালের জরুরী বিভাগ খোলা থাকে ২৪ ঘন্টা।প্রতিদিন হাসপাতালের বহি-র্বিভাগ বা আউটডোর সার্ভিস খোলা থাকে সকাল ৮.৩০টা থেকে বিকাল ৪.৩০টা পর্যন্ত। দন্ত, চোখেরছানি, জরায়ুক্যান্সার, হৃদরোগ, মুগুরপা, ঠোটের তালুকাটা, বার্ণ, অর্থপেডিক, ডায়াবেটিক, ফিজিওথেরাপি, স্ত্রীরোগ এবং শিশুরোগ নিয়ে বছরে ১২ থেকে ১৫টি বিশেষ ক্যাম্প পরিচালিত হয়ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের উদ্যোগে। শুধু হাসপাতাল কমপ্লেক্সে নয়, শ্যামনগরের বিভিন্ন ইউনিয়নে ছাত্র-ছাত্রী এবং বাড়ীর মহিলাদের নিয়ে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন ক্যাম্পেইন।