বাবা কতবছর তুমি “মা”বলে ডাকোনি, এতিম কন্যার খোলা চিঠি

166

আধুনিক সাতক্ষীরার স্বপ্নদ্রষ্টা মুক্তিযোদ্ধা শহীদ স.ম আলাউদ্দীনের কন্যা লায়লা পারভিন সেঁজুতি’র বাবার জন্মদিনে খোলা চিঠি।

হুবহু তুলে ধরা হল

বাবা,এক চিরন্তন ভালোবাসার নাম। জানিনা কেন দুটি অক্ষরের একটি শব্দ উচ্চারিত হবার সাথে সাথে আমাদের গোটা পৃথিবীতে এক অদ্ভুত আলোর ছটা আমাকে/আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে। নিমগ্ন হই বাবা’তেই,অনুভব করি বাবা সন্তানের মধুরতম সম্পর্ক।এ অন্তর বারবার জানান দেয় তুমিই আমাদের পৃথিবীতে আসবার ইতিহাস। তোমার জন্মের ইতিহাস সাতক্ষীরার মাটি মানুষের সাথে মিলে মিশে একাকার। এত কম সময় আমাদের জীবনে তোমাকে পেলাম, কিছুই জানা হলোনা,জানা হলো না কত ইতিহাস সবকিছু কত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। আমাদের জীবনে তোমার উপস্থিতিটা ছিলো, অনেকটা মেঘাচ্ছন্ন পৃথিবীতে এক চিলতে আলোর ছটার মতই। জানো বাবা, সেই এক চিলতে আলোর ছটা’ই আজও আলোকজ্বল পৃথিবীতে বিচরণে আমাদের জীবনে একমাত্র সহায়ক হিসাবেই কাজ করে। আজ তোমার ৭৪তম জন্মতিথি।বেঁচে থাকলে ৭৪বছরের বৃদ্ধ বাবাকে দেখতাম, অবশ্য আমাদের চোখে তুমি সেই তরতাজা ৫২’তেই আটকে আছো। চারটি ধবধবে সাদা শার্ট,কালো প্যান্ট আর সাদা পাজামা পাজ্ঞাবী ছিল তোমরা পরিধেয় বস্ত্র। কিন্তু ঘড়ি পরাটা ছিল তোমার সৌখিনতা। তোমার খুব Rado ঘড়ি পছন্দ ছিলো,আমরা বলতাম,তোমার তো অনেক মেয়ে,না হয় সবাই মিলে সবচেয়ে দামী Rado ঘড়িটা আমরা তোমাকে কিনে দেব। আজ আমরা এক একজন তোমাকে এক একটা ঘড়ি কিনে দিতে পারলেও তোমার হাতে সেটা উঠবে না, বাবা। তুমি ডান হাতে ঘড়ি পরতে জানতে চাইলে বলতে, আমার ভালো লাগে “মা”। সবকিছুতেই তুমি ছিলে ব্যতিক্রম। কী যে সম্মোহনী ক্ষমতা তোমার ছিলো,সেই ক্ষমতা দিয়ে তুমি আজও লাখো মানুষের মাঝে বেঁচে আছো,বাবা। কতবছর,তুমি “মা”বলে ডাকোনি। খুব শুনতে ইচ্ছা করে, যদি একবার ডাকতে, বিশ্বাস করো গোটা জগৎ কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলতাম, শুভ জন্মদিন বাবা —————————————-।

আজ দৈনিক পত্রদূতের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম আলাউদ্দীনের ৭৪তম জন্মদিন।

জীবন বৃত্তান্ত :: ১৯৪৫ সালের এই দিনে তিনি তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের মিঠাবাড়ি গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম সৈয়দ আলী সরদার এবং মাতার নাম সখিনা খাতুন। স. ম আলাউদ্দীন ১৯৬২ সালে কলারোয়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৬৪ সালে সাতক্ষীরা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৭ সালে খুলনা বিএল কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। এরপর ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা সাহিত্যে তিনি এমএ পাশ করেন। ১৯৬২ সালে মাধ্যমিকে ছাত্র থাকা অবস্থায় স. ম. আলাউদ্দীন অংশ নেন কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে। এরপর হামিদুর রহমান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন।
১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, ছাত্রদের এগার দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি সাতক্ষীরা অঞ্চলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৮ সালের গণআন্দোলনেও স. ম আলাউদ্দীন বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তালা-কলারোয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তিনিই ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য। ১৯৭২ সালে তিনি জাসদে যোগদান করেন। ১৯৮০ সালে তিনি পুনরায় আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত তিনি কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে আরও একবার তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে স. ম আলাউদ্দিন ছিলেন অন্যতম। তৎকালীন জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের ৪৬৫ জন সদস্যের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হন এবং কয়েকজন আত্মসমর্পন করেন। এছাড়া অন্যরা প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন এবং নেতৃত্ব দেন। হাতে গোনা কয়েকজন সরাসরি রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন। তাদেরই একজন সর্বকনিষ্ঠ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য স. ম আলাউদ্দিন। ১৯৯৫ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক পত্রদূত পত্রিকা। তিনি দৈনিক পত্রদূত’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। স. ম আলাউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, অবহেলিত সাতক্ষীরাকে উন্নত করতে হলে জনগণের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। এজন্য তিনি দৈনিক পত্রদূতকে গণমানুষের পত্রিকায় পরিণত করেন। এছাড়া স. ম আলাউদ্দিন প্রতিষ্ঠা করেন চেম্বার অব কমার্স, ভোমরা স্থল বন্দর ব্যবহারকারি সমিতি, বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক স্কুল, আলাউদ্দীন ফুড্স এন্ড কেমিক্যাল, নগরঘাটা মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ অসংখ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান। মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের সভাপতি ছিলেন স. ম আলাউদ্দিন। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন স. ম আলাউদ্দিন। এমনিভাবে সাতক্ষীরার উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে সময় কাটাতেন স. ম আলাউদ্দিন।

মৃত্যুর কারণ, ১৯৯৬ সালের ১৯ জুন দৈনিক পত্রদূত অফিসে কর্মরত অবস্থায় ঘাতকের গুলিতে প্রাণ হারান পত্রিকার সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ স. ম আলাউদ্দীন। এ ঘটনায় নিহতের ভাই স. ম নাসির উদ্দীন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার ৫দিন পর পুলিশ শহরের সুলতানপুর থেকে যুবলীগ কর্মী কাজী সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার এবং সাইফুলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত কাটা রাইফেলসহ পাইপগান, বন্দুক, ইয়ারগান, গন্ধক, মোমছাল, রাইফেলের বাট, স্প্রিংসহ বিপুল পরিমান অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিআইডি সুলতানপুরের সাইফুল্লাহ কিসলু (বর্তমানে মৃত) তার ভাই খলিলুল্লাহ ঝড়–, তার আর এক ভাই মোমিন উল্লাহ মোহন, আলিপুরের আব্দুস সবুর, নগরঘাটার আব্দুর রউফ, তার শ্যালক আবুল কালাম, সুলতানপুরের কাজী সাইফুল ইসলাম, আতিয়ার রহমান, এসকেন্দার মির্জা ও প্রাণসায়রের সফিউর রহমানকে আসামী করে চার্জশীট দাখিল করে। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করছেন পিপি এড. ওসমান গনি। তাকে সহায়তা করেন এড. আজাহারুল ইসলাম ও এড. ফাহিমুল হক কিসলু।