বাংলার মাহাথির শেখ হাসিনা : বাংলাদেশ হবে মালয়েশিয়া

মো. জাবের হোসেন :  আমরা যারা মোটামুটি লেখাপড়া জানি তারা প্রায় সকলেই মাহাথির মোহাম্মদের নাম শুনেছি।তার পুরো নাম মাহাথির বিন মোহাম্মদ।মাহাথির মোহাম্মদকে বলা হয় আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক।একাধারে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে নিজের মত করে মালয়েশিয়াকে সাঁজিয়েছেন।মালয়েশিয়াকে তিনি নিজের মত করে গড়ে তুলেছিলেন।

তার দল পর পর পাঁচবার ক্ষমতায় ছিলেন।তিনি এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

মাহাথির মোহাম্মদ যে বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেন (১৯৮১) , সে বছর মালয়েশিয়ার গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাকশন (GDP) ছিল মাত্র ১২ বিলিয়ন ডলার। আর যে বছর দায়িত্ব ছাড়েন সে বছর (২০০৩) মালয়শিয়ার গ্রস ডোমেস্টিক ইনকাম প্রোডাকশন (GDP) ছিল ২১০ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ৩০০০ ডলার, সাউথ ইস্ট এশিয়ার তৃতীয় সর্বোচ্চ মাথাপিছু ইনকাম।

এটা স্পষ্ট যে, মাহাথির মোহাম্মদ যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন অধিকাংশ মালয়েশিয়ান নাগরিক তাকে পছন্দ করতেন না।কিন্তু মাহাথির থেমে থাকেনি। তিনি নিজের মত করে কাজ করেছেন।যখন তিনি দেখলেন মালয়েশিয়া এখন তার স্বপ্নের সর্বোচ্চ চূড়ায় অারোহন করেছেন।তখন তিনি অবসর নেন।২০০৩ সালের ৩০শে অক্টোবর তিনি স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন।ঠিক তখনই মালয়েশিয়ার নাগরিকরা মাহাথিরের উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম হলেন।তারা তখন বুঝলেন মাহাথির ইতিমধ্যে মালয়েশিয়াকে এক অনন্ন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

মাহাথিরের এই দীর্ঘ সাফল্যের রহস্যটা কি?

এটা কি এলো, দেখলো, আর জয় করল এমন কিছু ছিল?

মটেও না। আমরা তো মুখে মুখে বলে ফেলি, আমরা মাহাথিরের মত লিডার চাই, কিন্তু মাহাথির মোহাম্মদের সময়ে মালয়শিয়ার এই ধারাবাহিক উন্নতির পেছনে মূল যে কারণ ছিল, সেইটা ছিলো controlled democracy (নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র)।

১৯৮০ তে মালয়শিয়াতে মাহাথির যখন ক্ষমতায় আসে মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক কথায় ছিলো টোটাল ক্যাওস।হরতাল ,মিছিল ,মিটিং লেগেই থাকত। ফ্রিডম অফ স্পিচের নামে মানুষ কাজ কাম বাদ দিয়ে সারাক্ষণ ব্যাস্ত থাকত পলিটিক্যাল তর্কাতর্কিতে।

মাহাথির বিশ্বাস করতেন , এই যে নানা ধর্মের ,নানা মতের মালয়েশিয়াকে একটি স্টেবল মালয়েশিয়া বানাতে যারা দেশে রাজনীতির নামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটায় তাদের কে জেলের ভিতরে ঢুকাতে হবে।যা ভাবলেন তাই করলেন মাহাথির। ১০৬ জন বিরোধী দলীয় নেতাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর দায়ে জেলে ঢুকালেন।

কোন আইনে ঢুকালেন? মাহাথিরের পাশ করা অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা আইন বা Internal security act দ্বারা। ক্ষোভে ফেটে পড়ল বিরোধী দল এবং মিডিয়াগুলো।

মাহাথির এবার নেমে পড়লেন মিডিয়াগুলোর পেছনে। প্রতিটি প্রাইভেট এবং সরকারি নিউজ পেপারে সেন্সর জারি করা হলো। জাতীয় পর্যায়ে ঝামেলার সৃষ্টি হয় এমন কোন নিউজ করা যাবেনা।

যখন হিউম্যান রাইটস্ গ্রুপ গুলো মাহাথিরকে প্রশ্ন করত where is our freedom?

মাহাথীর উত্তর দিত , “Free for whom? For rogue speculators. For anarchists wanting to destroy weak countries in their crusade for open societies.”।

এদিকে পশ্চিমা বিশ্ব তখন মাহাথিরের পিছে লেগে গেছে। মালয়েশিয়ার মানুষের মানবাধিকার নাই ,ফ্রিডম অফ স্পিচ নাই ইত্যাদি ইত্যাদি।

মালয়েশিয়াতে তখন সিআই এর এজেন্ট এনজিওগুলোর কাজই ছিল বিভিন্ন জরিপ ,প্রতিবেদন ইত্যাদি প্রকাশ করে এইটা প্রমাণ করার চেষ্টা করা।

মাহাথির মোহাম্মদ ইজ আ ডিকটেটর। মালয়েশিয়ায় কোন গণতন্ত্র নাই।

কিন্তু মাহাথির মোহাম্মদ তার লক্ষে অবিচল ছিলেন। তার লক্ষ ছিল একটি পলিটিক্যালি স্টেবল ডেভেলপড মালয়েশিয়া।

ক্ষমতা গ্রহনের প্রথমে দশ বছরে মাহাথির মোহাম্মদকে ভুল বুঝেছিল দেশের মানুষও। হিউম্যান রাইটস ,ফ্রিডম অফ স্পিচের ধুয়াতে বিশ্বাস করেছিল অনেকেই। কিন্তু মাহাথিরের লং টাইম প্ল্যানিং ই শেষ পর্যন্ত সফল হলো।

পলিটিক্যাল ইনডিসিপ্লিন মালয়েশিয়া কন্ট্রোল্ড ডেমোক্রেসিতে আজাইরা রাজনীতিতে বিজি না থেকে পরিশ্রম করে কাজ করে আজকের আধুনিক মালয়েশিয়া তে পরিণত হয়েছে।

এখন আর ফ্রিডম অফ স্পিচের লোকদের পাওয়া যায়না। তারা মাহাথিরের উন্নয়নের স্রোতে গর্তে লুকিয়েছে।

অবসর গ্রহণের দীর্ঘ পনের বছর পর ৯২ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাকের ব্যাপক দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ আবারও আসেন রাজনীতিতে। ২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পরদিন ১০ মে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি।

ঠিক এই একই ঘটনাটাই শেখ হাসিনার সামনে। ২০০৮ এ যখন ক্ষমতায় আসল, বাংলাদেশ তখন শুন্য রিজার্ভের ৬ ঘন্টা লোডশেডিং আর টেকনোলজিলেস বাংলাদেশ।

মাহাথিরের সামনে রাজাকারের ফাঁসি ছিলনা,কিন্তু শেখ হাসিনার সামনে সেই কঠিন দায়িত্বও ছিলো।

এদিকে মাহাথিরের মালয়েশিয়ায় যেমন দেশকে অস্থিতিশীল করে দেয়ার মত বিরোধী দল ছিল। শেখ হাসিনার বাংলাদেশে তেমন

পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ পোড়ানো দল আছে, যে দলকে শেখ হাসিনা শক্ত হাতে সামলেছেন।

মজার ব্যাপার হলো ,মাহাথির মোহাম্মদ মিডিয়া সেন্সর করতেন। আর শেখ হাসিনা অন্তত ১০-১৫ টা নতুন চ্যানেলের অনুমতি দিয়েছেন। থাকুক সমালোচনা। দেশ এগুবেই।

মাহাথির মোহাম্মদ এক সময় মিটিং – মিছিল নিষিদ্ধ করেছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের সময় কোটা আন্দলন ,নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছে। সরকার দাবি মেনেও নিয়েছে।

মাহাথির মোহাম্মদের ডেমোক্রেসিকে কন্ট্রোল্ড ডেমোক্রেসি বলা হলে ,শেখ হাসিনার ডেমোক্রেসিকে আমি বলব

প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেসি। প্রগতিশীল গণতন্ত্র।

২০০৮ এ দায়িত্ব নিয়ে দিন রাত পরিশ্রম করে দেশের মানুষ শেখ হাসিনার লিডারশীপে আজ এই পর্যায়ে এসেছে।কিন্তু অনেকেই চিল্লাচিল্লি করে দেশে পিঁছিয়েছে।

যদিও এ দেশে পশ্চিমা দেশগুলোর চর ধান্দাবাজ অনেক এনজিও সেটা মানতে নারাজ। তারা চায় বাংলাদেশ আবার কাজ কর্ম বাদ দিয়ে মিটিং মিছিল জ্বালাও পোড়াও শুরু করুক।

আজ্ঞে না। এদেশের মানুষ বুঝে গেছে দেশের উন্নতিতে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিবেশে জাতি হিসেবে পরিশ্রমের বিকল্প নাই।

এখনো অনেক দূর যাওয়ার বাকি। শেখ হাসিনাই হবে নেক্সট মাহাথির মোহাম্মদ। যাকে একসময় ভুল বুঝলেও, যার উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাবে সব প্রশ্ন।

এখন আমাদের উচিত জাতি হিসাবে শেখ হাসিনার উপর বিশ্বাস রাখা। যে বিশ্বাস মালয়েশিয়ার জনগণ একদিন মাহাথিরের উপর রেখেছিল।। শেখ হাসিনাই পারে, শেখ হাসিনাই পারবে।এক সময় বাংলাদেশ হবে মালয়েশিয়ার মত অাধুনিক রাষ্ট্র।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক,লাল সবুজের কথা

error: লাল সবুজের কথা !!