নগরঘাটার মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে

198
আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তপ্রায় নগরঘাটার মৃৎশিল্প। ছবি - লাল সবুজের কথা
আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তপ্রায় নগরঘাটার মৃৎশিল্প। ছবি - লাল সবুজের কথা

মো. জাবের হোসেন : একটা সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটা ঘরে রান্না থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া আর অতিথি আপ্যায়ন সহ প্রায় সব কাজেই মাটির তৈরি জিনিসের ব্যবহার ছিলো। স্বাস্থ্যকর আর সহজলভ্য ছিলো বলে সব পরিবারেই ছিলো এগুলোর ব্যবহার। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে শত শত বছরের এই শিল্প।

শীতের সময় এখনো খেঁজুরের রস সংগ্রহের জন্য মাটির তৈরি পাত্রের ব্যবহার সর্বত্র। গ্রাম বাংলার ঐতিয্যবাহী বাহারি চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, ভাঁপা পিঠাসহ বিভিন্ন রকমের পিঠার জন্য মাটির তৈরি খোলা (পাত্র), দধির পাতিল, টালি, ঘট, মুচি, মুটকি থালা-বাসনসহ বিভিন্ন মাটির সরাঞ্জাম ব্যাপকহারে তৈরি করতো কুমারেরা। সেগুলো সাইকেল, ভ্যান বা মাথায় করে দূর থেকে দূরান্তরে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যেতো তারা। তাতেই চলতো তাদের সংসার। এ যেনো খঁড়, কাঠি আর মাটির সাথে মিশে চলতো তাদের জীবনপ্রবাহ।
কুমারেদের বাহারি মাটির তৈরি সরাঞ্জাম দেখতে ভিড় জমতো শত শত দর্শেকদের। তারা নতুন চুলোয় আগুন দেবার সময় আয়োজন করতো মিষ্টি অথবা ছিড়ার মোয়া বিতরণ। তবে সময়ের পরিক্রমায় আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এসব ছিত্র। এখন আর এসম চিত্র দেখা মেলেনা বললেই চলে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিজ্ঞানের জয়যাত্রার ফলে প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন জিনিসের কাছে মাটির তৈরি জিনিসপত্র আজ বিলীন হতে চলেছে। যার ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে শত থেকে হাজার বছরের এই ঐতিয্য। কুমারেরা কুমার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ধাবিত হচ্ছে।

তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার নগরঘাটা ইউনিয়নের পালপাড়ায় মাত্র ৫০টি পরিবার মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত আছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার অন্যান্য পেশার সাথে জড়িয়ে কুমারের এ পেশা পর্যায়ক্রমে ত্যাগ করার উপক্রম হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে নগরঘাটা পোড়ারবাজারের দক্ষিণে অবস্থিত পালপাড়ায় অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই যায়-আসে আর ছবি তোলে কিন্তু কখনো কোনো ধরণের সাহায্য-সহযোগিতা তারা পাইনা।

মানিক পাল (৭২) নামের এক কুমার ও তার স্ত্রী তাদের দুর্বিসহ যন্ত্রণার কথা বলেন। এ বয়সে এসে এখনো এ কাজ করতে হচ্ছে, তবে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এ পেশায় তাদের সংসার চলছে না। তাই খেয়ে না খেয়ে কাটে তাদের সংসার। আবার এ পেশা ছেড়ে যে অন্য পেশায় যাবেন কিন্তু পুঁজি নেই বলে পেশা পরিবর্তন করতে পারছেন না তারা।

জোসনা পাল নামের এক মহিলা জানান, প্লাস্টিকের পণ্য বাজারে সয়লাব হয়ে গেছে। প্লাস্টিকের পণ্য সহজে বহনযোগ্য আর সস্তা হওয়ায় আমাদের এ ব্যবসা এখন আর ভালো নেই। খুবই কষ্টের মধ্যে দিনাদিপাত করতে হচ্ছে এখন।

নগরঘাটা পাল পাড়ার ময়না পাল, বিউটি পাল, মুক্তি পাল জানান আগে এ ব্যবসা করে সংসারের যাবতীয় খরচ মেটাতে পারতাম কিন্তু এখন দিনে দিনে ব্যবসায় ধ্বস নামছে। বাজারে চাহিদা কম থাকায় বেশি তৈরি করতে পারিনা। তাছাড়া মাটি, কাঠ, কয়লার যা দাম তাতে জিনিস উৎপাদনের খরচ অনেক বেশি হওয়ায় মানুষ প্লাস্টিকের পণ্যের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে গেছে। তারা আক্ষেপের সুরে বলেন সরকার এত এত শিল্পে সুযোগ-সুবিধা দেই, আনুদান প্রদান করেন অথচ আমাদের এই শত বছরের গ্রাম বাংলার ঐতিয্য রক্ষায় কেনো আমাদের পাশে নেই? সরকার যদি আমাদের আর্থিক সহযোগিতা এবং অন্যান্য সহযোগিতা করে তাহলে হয়তো এ শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তা না হলে হয়তো এ শিল্প জাদুঘরে উঠে যাবে। একটা সময় এ শিল্পের সাথে কেউ কাজ না করার ফলে মৃৎশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।