তালায় প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী বাস্তবায়নে ব্যাপক নয়ছয়

92
সাতক্ষীরায় প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী ২০২২ উদযাপনে পশুর স্টলে ফুচকার দোকান, পশুপাখি বিহীন ফাঁকা স্টল, পশুপাখি আনা হলেও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার পানি ও চিকিৎসা প্রদান করা হয়নি। ছবি- লাল সবুজের কথা
সাতক্ষীরায় প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী ২০২২ উদযাপনে পশুর স্টলে ফুচকার দোকান, পশুপাখি বিহীন ফাঁকা স্টল, পশুপাখি আনা হলেও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার পানি ও চিকিৎসা প্রদান করা হয়নি। ছবি- লাল সবুজের কথা

মো. জাবের হোসেন : প্রাণিসম্পদ ও ডেইরী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী-২০২২ বাস্তবায়নে সংশোধিত গাইডলাইন না মেনে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিসহ স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ অবস্থা যে শুধু তালা উপজেলাতে তা নয়, জেলার সব উপজেলায় এ অবস্থা হয়েছে বলে কমবেশি জানা গেছে। প্রতি উপজেলায় ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা বরাদ্দের হিসাবে সাতক্ষীরা জেলার সাত উপজেলায় ১৭ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

বর্তমান সরকার প্রাণিসম্পদ ও ডেইরী উন্নয়ন প্রকল্পের সামগ্রীক লক্ষ্য, প্রাণি সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি, দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার সৃষ্টি, ক্ষুদ্র খামারী ও উদ্যোক্তাদের প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা সক্ষমতা সৃষ্টি, জনসাধারণকে উন্নতজাতের পশু ও হাঁস-মুরগী প্রদর্শন করা, বিজ্ঞানভিত্তিক লালন-পালন কৌশল অবহিত করা, উন্নত জাতের পশু-পাখি ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ সহ নানা দিকনির্দেশনামূলক এ প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনী ২০২২ সারা দেশের ন্যায় সাতক্ষীরার ৭টি উপজেলায় উদযাপিত হয়েছে।

বুধবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তালা উপজেলা চত্ত্বরে এ প্রদর্শনী, মেলা ও আলোচনা সভায় আতিথিয়তায় সন্তুষ্টি হলেও এ প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য আড়াল করতে কর্মকর্তারা টাকা আত্মসাৎ করেছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরী উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি)-এর আওতায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এ প্রদর্শনী খামার পরিদর্শনের জন্য প্রত্যেক উপজেলায় ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সে টাকার কোন খাতে কিভাবে ব্যয় করতে হবে তার ১২টি দিক নির্দেশনাও দিয়েছে। সে দিক নির্দেশনার মানা হয়নি কিছু। ইচ্ছা-খুশিমতো মানুষের মগজ ধোলাই করে এ প্রদর্শনী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বেশিরভাগ স্টলে প্রদর্শিত পশুপাখি না আনতে পারায় ফাঁকা রয়েছে। অনেক স্থানে বিক্রি হচ্ছে ফুচকা ও চটপটি। এ প্রদর্শনী মেলায় অতিথি, স্টেজ, প্যান্ডেল, পশু, পাখি, গৃহপালিত হাঁস-মুরগী, খামারীসহ সার্বিক শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য পৃথক পৃথক বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। সেগুলো লুকিয়ে যেনতেন ভাবে চাকচিক্য আর সৌন্দর্য্যরে প্যান্ডেলে সাধারণ খামারীদের মগজ ধোলাই করে বেশিরভাগ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তালা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার সঞ্জয় কুমার বিশ্বাসের নিকট প্রদর্শনী ও ডেইরী উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের জন্য ব্যাপক প্রচার প্রসার সহ সার্বিক বিষয়ে তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, সবই মানা হয়েছে। বিধি মোতাবেক সবকিছু করা হয়েছে। তিনি বিরক্তিরসুরে বলেন, এই বিষয়টা নিয়ে কিছু সাংবাদিক আমাকে বিরক্ত করছে বার বার বলে ফোন কেটে দেন।

এসময় পরিবহন ব্যবস্থার জন্য ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলে তার অনুকূলে এক খামারী এ প্রকল্পের পুরস্কার গ্রহণের জন্য নিজ পকেটের টাকা ব্যয় করে ১ হাজার ৮শ টাকায় একটি পিকআপ ভাড়া করে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে। যার গাড়ি নং- ঢাকা মেট্রো-ন-১১-৫৮১৮

অন্যদিকে প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের উত্তরণ কমিউনিটি লিঃ এর এন.এ.টি.পি-২ ঢাকা মেট্রো-ড-১২-২১৯৭ নম্বরের গাড়িটি সামনে রেখে তা দেখিয়ে টাকা তছরুপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এমনকি প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া খামারীদের পশুর খাবার ও পাত্র সরবরাহ করা হয়নি। যা সাংবাদিকের উপস্থিতিতে বেলা ২টার পরে সরবরাহ করতে বাধ্য হয়।

এ প্রকল্পের উপজেলার নির্বাহী অফিসার সভাপতি থাকলেও নির্বাহী অফিসার প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে ছিলেন না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এ বিষয়ে তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস জানান, তিনি প্রোগ্রামে ছিলেন না। তবে সু-নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা বলেন। এর প্রেক্ষিতে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের তথ্য ধরেই তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন।

এ প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেক উপজেলায় ব্যানার বাবদ ৩ হাজার টাকা। প্যান্ডেল, স্টেজ, চেয়ার টেবিল, ফ্যান, সাউন্ড সিস্টেম, ডেকোরেশন ৬৯ হাজার ৫শ টাকা, ৫০টি দাওয়াত পত্রের জন্য ৫ হাজার টাকা, অতিথিদের জন্য ৯ হাজার টাকা, ৫০ স্পেশাল অতিথির জন্য ৪শ টাকা হারে ২০ হাজার টাকা। বিশেষ অংশগ্রহণকারী ৩শ জনের আপ্যায়নের জন্য ২শ টাকা হারে ৬০ হাজার টাকা। পশুপাখির খাবারের জন্য ৫০টির বিপরীতে ২শ টাকা হারে ১০ হাজার টাকা। চিকিৎসার জন্য ৫০টির বিপরীতে ১শ টাকা হারে ৫ হাজার টাকা। খাবারের পাত্রের জন্য ৫০টি জন্য ২৫০ হারে ১২ হাজার ৫শ টাকা। পুরস্কারের জন্য ৩টি ১০ হাজার টাকা হারে ৩০ হাজার টাকা। গবাদি পশু পরিবহনের জন্য ২টি ট্রাকে ২০ হাজার টাকা। প্রচার প্রসারণের জন্য ৫ হাজার টাকা। এই সর্বমোট ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা ডেইরী প্রকল্পের আওতায় প্রাণি সম্পদ প্রদর্শনীতে ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সাতক্ষীরার একটি উপজেলা ব্যতীত সব কয়টি উপজেলায় নয়-ছয় হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রত্যেক উপজেলায় ৫০ টি স্টল করা কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। তালা উপজেলায় ৫০টি স্টলের স্থলে করা হয়েছে ৩৫টি। আশাশুনিতে ২৪ টি স্টল, সাতক্ষীরা সদরে ৩৫ টি স্টল, কালিগঞ্জে ১৮ টি স্টল, কলারোয়ায় ৫০ টি স্টল এবং দেবহাটায় ৪২টি স্টল হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রাণি সম্পদ অফিসার ডা. এ.বি.এম আব্দুর রউফের কাছে ফোন করলে, বুধবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জানতে চাইলে তিনি ব্যস্থ আছেন বলে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। বৃহস্পতিবারও (১৭ ফেব্রুয়ারি) ফোন করলে তিনি ব্যস্থ আছেন, কথা বলতে পারবেন না বলে ফোন কেটে দেন।