ঢাবির টিএসসি চত্বর ভেঙে হবে বহুতল কমপ্লেক্স

138

২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উদযাপনের আগেই এটি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ (টিএসসি) এক অনিশ্চিত দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বিংশ শতকে নির্মিত এই স্থাপত্যটি অচিরেই ভেঙে একটি আধুনিক ভবনে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মূলত ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উদযাপনের আগেই এটি করা হবে।

গত ২ সেপ্টেম্বর সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), টিএসসি ও শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরিকে আধুনিকীকরণের কাজে এগিয়ে আসে।

সেদিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢামেকসহ অন্যান্য ভবন আধুনিকায়নের পরিকল্পনা অনেকখানি এগিয়ে গেলেও, টিএসসি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে টিএসসি’র আধুনিকায়নের জন্য যথাযথ নকশা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

গ্রিক স্থপতি ও পরিকল্পনাকারী কন্সটান্টিন অ্যাপোস্টলোস ডক্সিয়াডেস ১৯৬০ এর শুরুতে টিএসসি’র নকশা করেন। পরবর্তীতে টিএসসি ভবনটি তৎকালীন জেনারেল আইয়ুব খানের পাকিস্তানি সামরিক সরকারের তথাকথিত উন্নয়নের দশকের (১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সময়কাল) অংশ হিসাবে নির্মিত হয়েছিল।

ঢাবি কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ

ঢাবি’র নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মোঃ আব্দুল মান্নান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “সরকারের গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা যখন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তখন তারা আমাদের জানিয়েছিলেন এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকের প্রকল্প হবে, পুনর্নির্মাণ নয়। টিএসসি কমপ্লেক্সটি আধুনিক সুবিধাসমূহ এবং একটি নান্দনিক ও বহুতল ভবনে পুনর্নির্মাণ করা হতে পারে।”

তিনি বলেন, “পিডব্লিউডি’র সঙ্গে হওয়া শেষ সাক্ষাতে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় তালিকা জমা দিয়েছি। যদিও এখনও আমাদেরকে পরিকল্পনার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। তবে তারা জানিয়েছেন তাদের কাজ চলছে।”

তিনি আরও জানান, পিডব্লিউডি’র পক্ষ থেকে ঢাবি কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে, পুরো বিষয়টি সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় সম্পাদিত হচ্ছে।

কেমন হবে নতুন টিএসসি কমপ্লেক্স?

টিএসসি’র ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সৈয়দ আলি আকবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত তালিকা দিয়েছেন। পরবর্তীতে সেটি পিডব্লিউডি’কে দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, সেখানে নতুন যেসব সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছে সেগুলো হলো, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মহড়াকক্ষ, জিমনেশিয়াম, টিএসসি-ভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক দলগুলোর জন্য আধুনিক সুবিধা সম্বলিত কক্ষসমূহ, আন্তঃক্রীড়া কক্ষ, আলাদা ক্যাফেটেরিয়া, শিক্ষক মিলনায়তন, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য তিনতলা বিশিষ্ট স্থান, অতিথি কক্ষসহ আরও অনেকরকম আধুনিক সুবিধাদি।

সৈয়দ আলি আকবর বলেন, “তিনটি অডিটোরিয়াম থাকবে, যার একটিতে প্রায় ১,৫০০ জনের বসার ব্যবস্থা ও অন্য দু’টিতে ৩,০০ জন করে ধারণক্ষমতা থাকবে।”

তিনি জানান, নতুন একটি সুইমিংপুল কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় বা তৃতীয় তলায় নির্মাণ করা হবে।

এদিকে, পিডব্লিউডি’র ঢাকা সার্কেল-১৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাহাবুবুর রহমান নিশ্চিত করে জানান, সম্পূর্ণ টিএসসি ভেঙে ফেলেই নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে।

শনিবার (১৯ ডিসেম্বর) তিনি বলেন, “স্থপতিরা আমাদের জানিয়েছেন তারা নকশা প্রস্তুত করেছে, তবে সেটি আমাদের কাছে এখনও এসে পৌঁছায়নি। নকশা জমা দেওয়ার সম্ভাব্য দিন সোমবার হতে পারে।”

তিনি জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পরিকল্পনার অনুমোদন পাওয়া গেলেই পিডব্লিউডি তাদের কাজ শুরু করে দেবে।

কৃত্রিম আধুনিকতায় অনুপস্থিত প্রাণের স্পন্দন

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পুরনো টিএসসি ভবন ভেঙে ফেলার বিষয়ে গভীর বিষাদ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, “এটি কখনই হওয়া উচিৎ নয়। আমরা আমাদের চোখের সামনে এটিকে গড়ে উঠতে দেখেছি। এই টিএসসি চত্বর কেবলই একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়।”

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “টিএসসি চত্বরে সবসময়ই বিশাল মাঠ ও খোলা জায়গা রয়েছে। কিন্তু নতুন পরিকল্পনায় টিএসসি প্রকৃতি ও প্রাণের স্পন্দন হারাবে। কৃত্রিমতার চাপে সাংস্কৃতিক উদারতা হারিয়ে যাবে।”

তিনি বলেন, “কেবল বহুতল ভবন নির্মাণই একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে পারে না, সাংস্কৃতিক উন্নয়নও সেখানে সমানভাবে ভূমিকা রাখে।”