ডাকসু নির্বাচন : সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশা কি পূরণ হয়েছে ?

মোঃ জাবের হোসেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ সংক্ষেপে ডাকসু। ডাকসু প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯২৩-২৪ শিক্ষা বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। প্রথম নামকরণ হয় ডুসু। যেটি পরে ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষা বর্ষে গঠণতন্ত্র সংশোধনীর মাধ্যমে পূর্বনাম পরিবর্তন করে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)” গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। এই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ বলা হয়ে থাকে। সর্বশেষ জানুয়ারি ২০১৯ এর তথ্যমতে এই সংসদের সদস্য ৩৮৪৯৩ জন।

বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চেতনা ও স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার হলো এই সংসদ। সংসদটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই গৌরবময় ভূমিকা পালন করে চলেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান , ৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ স্বৈরচার ও সামরিকতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে এই সংসদ অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছে।

ডাকসুর প্রথম সম্পাদক ছিলেন (১৯২৪-২৫) যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, পরের বছর অবনীভূষণ রুদ্র, ১৯২৯-৩০ সালে আতাউর রহমান খান। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ভিপি (সহ-সভাপতি) হিসাবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান। ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১-৯১ সেশনে। সে বছর ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান আর সম্পাদক নির্বাচিত হন খায়রুল কবির খোকন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মোট ৩৬ বার নির্বাচন হয়েছে।

তারপর থেকে আর ডাকসুতে কোনো নির্বাচন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো নির্বাচন দিতে সাহস হয়নি । নব্বই পরবর্তী সরকাররা ভয় পেতো এই ছাত্র সংসদের । এজন্য দীর্ঘদিন কোনো নির্বাচন হতে দেয়নি। ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই মূলত নির্বাচন অনুষ্ঠানের অর্থবহ কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার ও ঘনিষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যার জন্য পর্যায়ক্রমে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য বিস্তার হতে থাকে।

তবে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকার এই নির্বাচনের জন্য এগিয়ে আসে। দীর্ঘ দিন পরে ১১ মার্চ দেশের এই ঐতিয্যবাহী সংসদে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন উপলক্ষে সভাপতি উপাচার্য সহ ২৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। নির্বাচনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নুরুল হক নুরু ভিপি এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গোলাম রব্বানী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তারা দুইজন ডাকসুর ২৫ তম নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি।

২০১২ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ জন সাধারণ শিক্ষার্থী উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। ২০১৭ সালে ৪ঠা মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনে ডাকসুর নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। একই বছর ডাকসুর নির্বাচনের দাবিতে অনশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওয়ালিদ আশরাফ।

এরই মধ্যে ২০১৭ সালের রিটের বিপরীতে ডাকসুর নির্বাচনের নির্দেশনা দেয় উচ্চ আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতের আদেশের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও নির্বাচনের কোনো আয়োজন না দেখে, ২০১৮ সালে ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিশ পাঠায় মনজিল মোরশেদ। কিন্তু তাতেও কোনো জবাব না পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবমাননার অভিযোগ আনেন। পক্ষান্তরে উচ্চ আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা দেয় যে ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

অবশেষে ১১ মার্চ সারাদিন ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পরে রাত ৩ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও নির্বাচন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড: মো. আখতারুজ্জামান ফলাফল ঘোষণা করেন। তার ফলাফল ঘোষণার সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা ‘মানিনা..মানিনা..মানিনা..ভূয়া..ভূয়া..ভূয়া’ স্লোগান দিতে থাকে। তাকে ছাত্রলীগের কর্মীরা অবরুদ্ধ করে রাখেন। সরকারী দলের মনোনীত প্রাথী ছাত্রলীগের রেজওয়ানুল হক চৌধুরি শোভন হতে না পারায় তার সমর্থকরা বিশৃঙ্খল করতে থাকে। প্রায় ২ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছে সে। এদিকে জিএস পদে ও এজিএস পদে জিতেছেন ছাত্রলীগের গোলাম রব্বানী ও সাদ্দাম হোসেন ।

অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে ছাত্রলীগ বাদে বাকি সব প্যানেল ভোট বর্জন করে দুপুরেই। একে প্রহসনের নির্বাচন বলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে বিক্ষোভ ও মিছিল সমাবেশ করে তারা। ভোটের পরদিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকে।

নির্বাচন নিয়ে মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরণের খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। তাতে দেখা যাচ্ছে একপক্ষ আরেক পক্ষের দোষারোপ করছেন। নির্বাচনের প্রথমাধ্যে বলা হচ্ছিলো ব্যালট পেপার ভোট শুরু আগেই বাইরে কি করে। তবে অনেকেই বলছেন সেই ব্যালট পেপার আসলটা না।

তবে অনেকই বলেছেন, এমন ফলাফল দেখে বিস্মিত ! নুরু ভিপি হলে সেক্ষেত্রে তার প্যানেল রাশেদ জিএস হওয়ার কথা। কারণ নুরু যে ভোটগুলো পেয়েছে সেই ভোটগুলোও তো রাশেদের পাওয়ার কথা। অন্যদিকে জিএস গোলাম রাব্বানী যে ভোট পেয়েছে ভিপি প্রার্থী শোভনেরও পাওয়ার কথা। ঘটনা পুরা তালগোল। আবার অনেকই বলছেন, এই নির্বাচনে ভিপি নুরুর শপথ না নিয়ে পূনরায় নির্বাচনের জন্য সব ফলাফল প্রত্যাহার করা উচিত। ভিপি হিসাবে শপথ নিলেও এ পদে সে টিকে থাকতে পারবেনা বলে অনেকেই মতামত ব্যক্ত করছেন। আবার অনেকইে বলছেন ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী শোভন স্যালুট পাওয়ার যোগ্য। তিনি অনেক বড় একটা ত্যাগ স্বীকার করে দলের সম্মান রক্ষা করেছেন।

দুপুরের আগেই য়েখানে নির্বাচিত ভিপি নুরু নির্বাচন বর্জন করলেন সেখানে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে তিনি কীভাবে ভিপি হলেন এটা অনেকেরই প্রশ্ন! কারণ সেই নুরুই এখন নির্বাচিত ভিপি। তাহলে কি নুরু শপথ নিবেন , না কি তার প্রত্যাহারের কথাগুলো মিথ্যা ? এখন সে যদি শপথ নেয় তাহলে তার আনিত অভিযোগ মিথ্যা ? আর যদি শপথ না নেয় তাহলে আনিত অভিযোগ সত্য। অন্যদিকে জিএস রাব্বানীও পূনরায় নির্বাচনের জন্য অভিযোগ করছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে সেটি প্রশ্ন? দীর্ঘদিন পরে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে সেটি কোনো শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা ছিলোনা।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক,লাল সবুজের কথা

error: লাল সবুজের কথা !!