ছোটো গল্প: বিদায়

149
সুফিয়ান জুয়েল

সুফিয়ান জুয়েল: ছেলেবেলায় বিয়েবাড়ি থেকে বর- বধূর বিদায় লগ্নে খেলাধুলা ছেড়ে দলবেঁধে দৌড়ে দেখতে যেতাম ।এত আগ্রহ নিয়ে দৌড়ে যাবার একটি কারণ হল বরকে দেখা। আর প্রধান কারণটি হল- নববধূ কেমন করে কাঁদছে তা দেখা।কান্না দেখে সেখানেই সবাই জট পাকিয়ে খিলখিলিয়ে হাসতাম।একেক বধূ একেক ভাবে কাঁদত।আর আমরা,কোন বাড়ির বধূ কেমন করে কেঁদেছিল তা রপ্ত করে ফেলেছিলাম। বহুদিন এটা আমাদের বিনোদনের খোরাক ছিল।

২০০৯ সালের প্রথম দিকে,তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছি।প্রতিবেশী এক ফুফাতো বোনের বিয়ে;সারারাত আতশবাজি, পটকা-বাজি করেছি।সকালে হতে অনুষ্ঠান। হঠাৎ সকাল প্রায় ৭ টার সময়, আপু(যার বিয়ে) আমাকে ডেকে বললেন,” বাজার থেকে এক কেজি মিষ্টি নিয়ে আয়।আর কসমেটিকসের দোকানে গিয়ে চারটা প্রদর্শনী ঘুঘু পাখির টয়,একটা জেল কালির কলম নিয়ে আসবি।”আমি বললাম মিষ্টির কি দরকার? বাড়িতে তো অনেক মিষ্টি আছে।আমার মুখে তৎক্ষণাৎ হাত দিয়ে বললেন, “চুপ করে থাক।” সাথে সাথে তার দুচোখের কোণ বেয়ে দুই ফোটা অশ্রু নেমে এল।আমি কিছু না বুঝে ঝটপট কথামত সব কিনে এনেছি।এসে দেখি,আপুর চারজন বান্ধবী এসেছেন। একই এলাকায় বাসা হওয়ায় সবাইকে চিনতাম।

যখন আপুর বিয়ে হয় তখন তিনি দশম শ্রেণিতে পড়েন।ওরা পাঁচজনকে সবসময়ই একসাথে হাটতে দেখতাম।আপুর বান্ধবীরা আমার হাতে এতসব দেখে তো অবাক।আমার হাত থেকে সব নিয়ে আপু মিষ্টির প্যাকেটটা আমার হাত থেকে নিয়ে চার বান্ধবীর সামনে ফেলে দেন আপু।তারপর দাত কটমট করে বলে ওঠেন,” এই নে মিষ্টি!.. খা… শামীমের রেস্টুরেন্টে আমি আর মিষ্টি খাওয়াতে পারব না।তোরা খেলে একা একা খাবি।তোদের সাথে যাওয়ার টাইম আমার নেই।” ক্রমেই চারটি মুখে মেঘের ছায়া নেমে আসে।একজন বান্ধবীর নাম ছিল সুমি।

তিনও বলেন, __আজ না একদম খাওয়ার ইচ্ছে নেই।পাকস্থলী কোনভাবেই সাপোর্ট দিচ্ছেনা।তবু,তুই যখন বলেছিস সব খাবো।একটুও রাখবো না।

বলেই খাওয়া শুরু করে সবাই।আমি বাকরুদ্ধ হয়ে হা করে দাড়িয়ে সব দেখছি। ময়না আপু আমাকে ধমকে ওঠে,
___তুই খাবি না?
এরপর আমাকে জোর করে দুটো খাইয়ে দেন তিনি।
আপুকে সবাই একের পর এক খাইয়ে দেন।
আমি সেখান থেকে বেরিয়ে যাই।আমার শিশুমনে কেমন জানি একটা শুণ্যতা অনুভব করতে থাকি।কৌতুহলবসত বারবার সাজঘরে উঁকি মারতে থাকি।

বরযাত্রী আসার আগেই খাবার নিয়ে আসে আপু।এরপর একে অপরের মুখে যখন সবাই ভাত তুলে দিচ্ছিল তখন সবার চোখ থেকে ঝরঝর করে বৃষ্টির মত অশ্রু ঝরে পড়ছিল।খাওয়া শেষ হতে না হতেই আপুর মুখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। চোখ মুছতে মুছতে বলা শুরু করেন-

———মারুফ স্যারের প্রাইভেটে কাল যাব না।স্কুলে ক্লাসটিচার সাজিদ স্যারকে বলে দিবি আমার নামটা হাজিরা খাতা থেকে কেটে দিতে।আর সুমি তুই তোর আম্মাকে বলে দিস কখনো আর তোদের বাড়িতে পিঠা বানিয়ে দেব না।দিয়া,তুই না বলেছিলি যে এসএসসি পাস করে আমরা ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেব? আমার টাইম নাই। আমি তো বি এ( বিয়ে) পাস করে নিচ্ছি! আর কি দরকার?

সবাই ওড়না দিয়ে চোখ মুছেন।তবু কথা যেন ফুরোয় না,
——–আমার আম্মাকে তোরা বলে দিস,আজ থেকে যাতে বেশি ভোরে ওঠে।অত আয়েশ করে খেতে হবে না।ঝটপট যাতে আঙিনা আর ঘর ঝাড়ু দিয়ে ফেলে

মীরা আপু আস্তে আস্তে বলেন,”ঠিক আছে বলব।”

মুয়াজকে (ছোটভাই) বলবি,স্কুলে যেতে যেন আর বলতে না হয়।ওর হাত-পা যাতে একা একা ধুয়ে নেয়!সন্ধ্যা হলে যেন একা একা পড়তে বসে।ওকে আমি আর পড়া বলে দেব না।পটেটো কেনার জন্য যাতে আব্বার কাছে টাকা চেয়ে নেয়।আমার ব্যাগ খু্জলে ও তো আর পাবে না!

(কারো জবাব নেই।চুপ করে নিচ দিকে তাকিয়ে থাকেন)

—–দাদিকে বলবি আব্বার কাছে যেন দামি একটা লাইট কিনে চায়।রাতে একা উঠে যেন টয়লেটে যায়।আব্বাকে বলবি স্কুলে গিয়ে যেন আর রেজাল্টের খোঁজ না নেন।আমার শ্বশুর বাড়ি যেন সপ্তাহে একবার করে যায়।সবকিছু সহ্য করতে পারব! কিন্তু,আব্বাকে যতক্ষণ না ভাত বেড়ে দেব ততক্ষণ আমার রাত হবে না।আমার গলায় ভাত আটকে যাবে!

আরেকটা কথা!
–নোমানকে বলিস পাগলের মত যাতে আর আমার জন্য আগে স্কুলে গিয়ে দাড়িয়ে থাকে না।ছেলেটা এতবার চিঠি দিল,এতবার প্রস্তাব দিল।তোরা বলছিলি ছেলেটাকে এতবার ফিরিয়ে দিস না।বোকা মেয়েরা! আজ ছেলেটা আরো বেশি কষ্ট পেত।ও যাতে আমাকে ভেবে আর ওর পড়াশোনা নষ্ট না করে।ওকে তো অনেক বড় হতে হবে!

বখশিশ স্বরুপ আমাকে আপু কলমটা দিয়েছিলেন।প্রদর্শনী ঘুঘু চারটা চার বান্ধবীকে ধরিয়ে বলেছিলেন,

——–আজ থেকে তোরা চারজন স্কুলে যাবি।স্কুল থেকে ফিরে বাসায় ঘুঘুটা দেখে একবার হলেও তোদের বান্ধবীকে ভাবিস! ওটার মধ্যেই আমি মিশে থাকব।

একটা শব্দ,একটা ক্ষণ আর ঐ একটা পর্বে যে এত আবেগ জড়িয়ে আছে সেদিন আমার শিশুমনও বুঝেছিল।

বিকেল হতেই বরযাত্রীর গাড়ি প্রস্তুত। রোলপড়া কান্নায় গাড়িতে উঠলেন আপু।আমার মনে হচ্ছিল কে যেন কারো পকেট থেকে মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিচ্ছে।অথচ,এত মানুষ দাড়িয়ে উপভোগ করছে; কেউ এগিয়ে এসে বাঁধা দিচ্ছে না।নদীতে ডুবন্ত মানুষের মতই যেন আপু আজ অসহায়।সেই অসহায়ত্ব আমার হৃদয় ছু্য়েছিল।

সেদিনও আমার খেলার সাথীরা ছুটে এসেছিল চলে যাওয়া উপভোগ করতে।সবার কান্না দেখে পৈশাচিক হাসি হাসছিল আর ভেংচাচ্ছিল ওরা।আজ আমি আর হাসলাম না।খড়ের গাদার পেছন থেকে চুপিচুপি দেখলাম।পরে বাসায় গিয়ে কতক্ষণ কেঁদেছিলাম মনে নেই।তবে,তারপর থেকে কোন বউ বিদায়ের দৃশ্য ইচ্ছাকৃতভাবেই দেখি নি।কখনো বরযাত্রীর গাড়ির পাশে বিকেলবেলা দাড়াই নি।

আপুর আদেশগুলো তার বান্ধবীরা তার মত করে সবাইকে বলেছিল কি না জানি না।তবে,আমি নিশ্চিত যে তার বলা কথাগুলো সবাই আগে থেকেই জানতো।হয়তো,তার কথামতই আপুর মা পরদিন খুব ভোরে উঠেছিল।

লেখক: শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।