সর্বশেষ সংবাদ

গ্রাম জেগেছে, নজর দিন সুশাসনে

শেখ রোকনঃ দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মনে করেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের যে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধির হার, তার মূলে রয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির জাগরণ। কৃষি খাত ও উপখাতের উৎপাদন বৃদ্ধিই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত গড়ে দিয়েছে। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অপচয় রোধ করা গেলে গ্রাম উন্নয়নে গ্রামীণ অর্থনীতিই অবদান রাখতে পারবে। সমকালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই উন্নয়ন-অর্থনীতিবিদ সরকারের আগামী মেয়াদে ‘গুড গভর্ন্যান্স’ বা সুশাসনে নজর বাড়াতে বলেছেন।

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মনে করেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামীণ জনপদের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। এগুলোকে এখন কর্মসূচি আকারে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই নীতি ও কর্মসূচি দেশের সব ভৌগোলিক অঞ্চলে সমানভাবে কার্যকর হবে না। এ জন্য প্রয়োজন অঞ্চলভেদে আলাদা নীতি, কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদে গ্রামীণ অর্থনীতি ও উন্নয়ন ধরে রাখতে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়ন কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা। সরকারের অনেক কর্মসূচিই গ্রামাঞ্চলে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুফল পাচ্ছে না রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ‘মধ্যস্বত্বভোগী’র কারণে। গ্রামীণ জাগরণ ধরে রাখতে হলে আগামী পাঁচ বছর এ বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

সমকালের পক্ষে জানতে চাওয়া হয়েছিল গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশের মূল শক্তি সম্পর্কে। তিনি সমকালকে বলেন, শুধু গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয়, জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পসহ রফতানি খাত ও রেমিট্যান্সের ভূমিকা থাকলেও মূল অবদান রেখেছে কৃষি উৎপাদন। প্রবৃদ্ধির মূল ভিত গড়ে দিয়েছে গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থা। এক দশকে প্রথম ছয় বছর ৬ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল। পরের তিন বছর ছিল ৭ শতাংশের ওপরে। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে। এই হার বিশ্বের জন্য বিস্ময়কর হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। তার মতে, শস্য বা দানাদার ফসলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। গত এক দশকে বিকাশ লাভ করেছে এবং সম্প্রসারিত হয়েছে কৃষির উপখাতগুলো। এর মধ্যে রয়েছে মৎস্যসম্পদ, প্রাণিসম্পদ ও বনজসম্পদ খাত। বিশেষত, মৎস্যসম্পদে বাংলাদেশ এরই মধ্যে শীর্ষস্থানীয় দেশে পরিণত হয়েছে।

দেশে যেখানে বনজসম্পদ হ্রাস নিয়ে পরিবেশবাদীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, সেখানে এই খাতের প্রবৃদ্ধি কীভাবে সম্ভব? কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ স্বীকার করেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছপালার ঘনত্ব কমেছে। কিন্তু সড়ক-মহাসড়কে সামাজিক বনায়ন বেড়েছে। বেড়েছে গ্রামে ব্যক্তিগত বাড়ি-ভিটায় গাছ লাগানোর প্রবণতা। এ দুই খাত থেকেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বেড়েছে। তবে সামাজিক ও ব্যক্তিগত বনায়নের পাশাপাশি সংরক্ষিত বনায়ন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। কারণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সংরক্ষিত বনায়ন থাকতেই হবে। একটি দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় যে নূ্যনতম ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকতে হয়, বাংলাদেশ সেখান থেকে এখনও পিছিয়ে রয়েছে।

মাছের উৎপাদন বাড়লেও সামষ্টিক মৎস্যক্ষেত্র, যেমন- নদীনালা, বিল-ঝিলের মতো উন্মুক্ত জলাশয়ে সাধারণ মানুষের মাছ ধরার অধিকার ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। বেড়েছে জলমহাল ইজারা দেওয়ার হার। ফলে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কি সাধারণ মানুষ পাচ্ছে? কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ স্বীকার করেন, গত ১০ বছরে মৎস্যসম্পদের সাফল্য হচ্ছে উৎপাদনে ধারাবাহিকতা। উন্মুক্ত জলাশয়ে জনসাধারণের অধিকার কমেছে বটে। উৎপাদন বাড়ায় একদিকে মাছ সুলভ হয়েছে, অন্যদিকে সার্বিকভাবে ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। জলাশয় উন্মুক্ত থাকায় অব্যবস্থাপনার কারণে সার্বিক উৎপাদন প্রতিবছর কমে যাচ্ছিল। উৎপাদন হারের অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, ইজারাপ্রথার বদলে জলাশয় উন্মুক্ত রেখেই ‘কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট’ বা সামাজিক ব্যবস্থাপনায় সুফল আরও বাড়ত এবং সুষম হতো।

কৃষি খাতে আগামীর চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভূমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে আমলে নিতে বলেন কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, এ কারণে কৃষি গবেষণায় মনোযোগ বাড়াতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির মেরুদণ্ড গ্রামাঞ্চল হঠাৎই উৎপাদন হ্রাসের শিকার হতে পারে।

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের মতে, গ্রামীণ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে অকৃষি উৎপাদন খাত। আগে যেসব খাত বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হতো, তার বদলে এখন ‘গুচ্ছ’ উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সিরাজগঞ্জে গড়ে ওঠা জুতাশিল্প, যশোরে গাড়ির ‘বডি বিল্ডিং’ খাত গড়ে ওঠার কথা বলেন। ফুলের বাণিজ্যিক চাষাবাদও আরেকটি সম্প্রসারণশীল অকৃষি খাত।

গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নেও বৈষম্য রয়েছে বলে মনে করেন কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, দেশে এখনও অন্তত ১৬টি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী রয়েছে। যেমন- প্রতিবন্ধী, দলিত, বেদে, চা শ্রমিক, হিজড়া, ভিক্ষুক, নারী কৃষি শ্রমিক। ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে হাওর অঞ্চলবাসী, চরাঞ্চলবাসী, উপকূলীয় অঞ্চলবাসী। পিছিয়ে পড়া সব জনগোষ্ঠীর জন্য একই কর্মসূচি কাজে আসবে না। তাদের সমস্যার ধরন আলাদা, সমাধানও আলাদা। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা কর্মসূচি নিতে হবে। তিনি মনে করেন, এসব সমস্যা এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। এখন কর্মসূচি নিতে হবে।

আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ স্লোগান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, এর অর্থ এই নয় যে গ্রামাঞ্চল অবকাঠামোগত দিক থেকে বদলে যাবে। ফসলের মাঠ ও গাছপালার বদলে ইট-কাঠের বাড়িঘর হবে। এই প্রতিশ্রুতির মূলে রয়েছে গ্রামীণ জনপদেও শহরের মতো সেবা পাওয়া যাবে। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে। কৃষিপণ্যের উপযুক্ত বাজার সৃষ্টি হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মান বাড়বে। গ্রামে বসেই শহরের মতো বিদ্যালয় ও হাসপাতাল সুবিধা পাওয়া যাবে। তিনি মনে করেন, এতে করে একদিকে যেমন শহরের ওপর চাপ কমবে, তেমনি গ্রামে বাড়বে উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান।

ইন্টারনেট সবার হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়ায় আগামী দিনে ‘আউটসোর্সিং’ গ্রামীণ জনপদের কর্মসংস্থানের উৎস হতে যাচ্ছে বলে কাজী খলীকুজ্জমান মনে করেন। গত দুই মেয়াদে বর্তমান সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলায় জোর দিয়েছে। তার মতে, এতে করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে।

আওয়ামী লীগের ইশতেহারে তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দেওয়ায় কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত এক দশকে মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণ বেড়েছে। ২০০৮ সালের ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৮ সালে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে এ হার আরও বাড়বে। কমবে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার।

সরকার গত দুই মেয়াদে গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশে জোর দিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারেও রয়েছে উন্নয়ন ও সেবা সম্প্রসারণের অনেক প্রতিশ্রুতি। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে? কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ সমকালকে বলেন, কর্মসূচি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি, অনিয়ম-অপচয় কমানো গেলে খুব বেশি বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে না; বরং উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সুব্যবস্থা করা গেলে গ্রামাঞ্চল থেকেই আসবে গ্রামীণ উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ। নিজের উন্নয়ন ও বিকাশে নিজেই অবদান রাখার সামর্থ্য বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদগুলো অর্জন করেছে।সূত্র : সমকাল

error: লাল সবুজের কথা !!