খাদ্যে ভেজাল কি শুধু রমজানে?

মো. জাবের হোসেনঃ রমজান মাস বিশ্বের সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য একটি নিয়ামতের মাস। রমজানের ত্রিশ দিনকে তিনটা ভাগে ভাগ করে মহান আল্লাহ বিশ্বের সকল মুসলমানদের নিকট পাঠিয়েছেন। মাগফিরাত, রহমত এবং নাজাত।

রমজান মাস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপরে মূল্যছাড় প্রদান করে। এছাড়া বিভিন্ন রকম অফার তো থাকেই। কিন্তু আমাদের দেশে কি হয়? রমজান মাস আসলেই আমাদের দেশের বাজারগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি শুরু করে। যতই রমজান বাড়তে থাকে ততই পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। সেই সাথে বাড়ে খাদ্যে ভেজালের প্রকোপ। দেশে

বেপরোয়া হয়ে ওঠে ভেজালপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যেসব ভেজাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে তা মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কখনো কখনো ডালডা,গাম আঠা আর ফ্লেভার দিয়ে খাঁটি ঘি, কেমিক্যাল দিয়ে জুস,নদীর পানির সাথে গুড়া দুধ দিয়ে মিশিয়ে তরল দুধ তৈরি, কখনোবা পাঁচ বছর আগের তৈরি তেল নতুন করে লেবেলিং দিয়ে বাজারে ছাড়ার মত ঘটনা অহরহ ঘটছে।

রমজান আগে থেকেই ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের প্রহর গুনতে থাকে।অতিরিক্ত অর্থ গুনেও যদি খাটি পণ্য পাওয়া যেতো তা না হয় একদিক থেকে ভোক্তাদের লাভ হতো।কিন্তু একদিকে অতিরিক্ত অর্থ, অন্যদিক ভেজাল।কোনদিকেই যেনো স্বস্থি নেই ভোক্তাদের। টাকা দিয়ে রমজানে কিনে খেতে হচ্ছে বিষ।সেই বিষ খেয়েই পার হচ্ছে রমজান।

খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট বা বিএসটিআই। প্রতিষ্ঠানটি দেশের সকল উৎপাদিত পণ্যের ছাড়পত্র প্রদান করে মান যাছাই শেষে। সরকারী এই প্রতিষ্ঠানটির খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো মাথাব্যথা। সরকারী এই প্রতিষ্ঠানটিতে নেই কোনো সুনিদৃষ্ট তদারকি। তদারকি ছাড়াই চলে বছরের অধিকাংশ মাসগুলো। কিন্তু রমজান মাস আসলেই দেখা যায় সরকারী এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব-কর্তব্য বেড়ে যায়।ঘন ঘন বাজার মনিটরিং। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণ ইত্যাদি ইত্যাদি।

রমজান আসলেই সারা দেশে এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কড়াকড়ি নিয়ম জারি করে। কিন্তু বাকী সময়গুলোতে তারা থাকে নিষ্ক্রিয়। রমজান মাস আসলেই প্রতিষ্ঠানটি বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদান করে।কিন্তু অন্য সময় প্রতিষ্ঠানটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়না।
মানুষ তো আর শুধু রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করেনা। শুধু কি মানুষ রমজান মাসে ভালো খাবে? বাকি বছরগুলো কি খাবে? এক বছরে ১২ মাস।একটা মাস ভালো খাবে, বাকি মাসগুলো খারাপ খাবে? এক মাস বাজার মনিটরিং করেই কি বিএসটিআই দায়সারা? বাকি মাসগুলোর দায়িত্ব কে নিবে?

দেশের খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠানগুলো কি শুধু রমজান মাসে খাদ্যে ভেজাল দেয়? যদি তাই না দেয় তাহলে কেনো শুধু রমজান মাসে বিএসটিআই এর এই বাজার মনিটরিং? বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো রমজান আসলে ভোক্তাদের সুবিধার্তে যেখানে পণ্যের উপর অতিরিক্ত দাম হ্রাস অফার চালু করে। সেখানে আমাদের দেশে কেনো রমজান মাস আসলেই দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ে? এ দায়ভার কে নিবে? এ ব্যার্থতা কাদের?

রমজান মাস শুরুর আগে খোলা বাজার থেকে ৪০৬টি পণ্যের নমুনা ক্রয় করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট বা বিএসটিআই। এরপর সেসব পণ্য বিএসটিআই-এর ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়। এর মধ্যে ৫২টি পণ্য ল্যাব পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে।
বাংলাদেশে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বা বিএসটিআই যেসব কোম্পানির পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সেটি ভোক্তাদের রীতিমতো দুশ্চিন্তায় ফেলার মতো। ঠিক রমজানের আগেই কেনো বিএসটিআই এই সিদ্ধান্ত নিলো? তারা তো সারাবছরই পারে এই ব্যবস্থাটা গ্রহণ করতে। সারা বছর বাজার মনিটরিং করতে তাদের বাঁধা কোথায় সেটা আমার জানা নেই।

দেশের নামি-দামি ব্রান্ডগুলোর অবস্থা যদি এই হয় তাহলে না জানি লোকাল ব্রান্ডগুলোর কি অবস্থা? কি খাচ্ছি আমরা? দামি ব্রান্ডগুলোকে যদি আমরা বিশ্বাস করতে না পারি,দামি ব্রান্ডগুলো যদি বিএসটিআই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারে তাহলে আমরা বাজারের কোন ব্যান্ডগুলোকে বিশ্বাস করবো? এতদিন ধরে ভোক্তাদের কি খাওয়াচ্ছে কোম্পানীগুলো? রমজান মাস আসসলেই বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট বা বিএসটিআই এর দায়িত্ব বেড়ে যায়। আর রমজান শেষ হলেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।

এই যদি হয় ভোক্তা অধিকার তাহলে দেশের মানুষ কোথায় যাবে? কি খাবে সেটি ভাবনার বিষয়। যতদিন না বাজার ব্যবস্থা যথাযথ মনিটরিং করা হবে,যতদিন না অসুস্থ্য মস্তিষ্ক পরিহার করা না যাবে ততদিন আমরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবোনা।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক,লাল সবুজের কথা

error: লাল সবুজের কথা !!