কেশবপুরে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ করলো বিএনপি’র নেতা ॥ ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে টাকার বিনিময় সাংবাদিক সম্মেলন করলো মেয়ের পিতা

32
কেশবপুর
কেশবপুর

আজিজুর রহমান, কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি: কেশবপুরে (১৫) বছরের এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ করলো বিএনপি’র নেতা বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ১৮ জুলাই একাধিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর ধর্ষণের ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেছে মেয়ের পিতা। এ নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। শালিসকারীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধর্ষণকারীকে রক্ষার্থে ধর্ষিতার বাবা-মা এলাকায় এখন তাদের মেয়ে ধর্ষিত হয়নী বলে প্রচার করে চলেছে। ধর্ষণের ঘটনাটি এলাকায় লটে গেলে প্রভাশালী একটি মহলের ইন্দোনে বিষয়টি গ্রাম্যভাবে মীমাংসা করে দেবেন বলে থানায় অভিযোগ করতে নিষেধ করে।

ওই সময় অভিযুক্তকে বাঁচাতে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মীমাংসার নামে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের হুমকির মুখে ঘটনা চেপে রাখতে বাধ্য হয় ওই কিশোরীর পরিবার। ১১ জুলাই বুধবার কেশবপুর উপজেলার গৌরীঘোনা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ইউনুস ফকির (৫০) ওই গ্রামের বাসিন্দা গৌরীঘোনা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় এখনও সে বহালতবিয়তে রয়েছে।

উল্লেখিত কিশোরীর পরিবার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সকালে মায়ের সাথে মাঠে যায় ওই কিশোরী। সেখান থেকে একা বাড়িতে আসার পথে মিষ্টি কিনে দেয়ার কথা বলে গৌরীঘোনা বাজারের নিজের রাইচ মিলঘরে ডেকে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে ইউনুস ফকির। ওই সময় বৃষ্টি এলে কুলসুম নামে এক নারী মিলঘরে আশ্রয় নিতে যেয়ে ধর্ষণের ঘটনা দেখে ফেলে। বিষয়টি তিনি বাড়িতে যেয়ে মেয়ের পরিবারকে জানায়। পরে পরিবারের কাছে ধর্ষণের বিস্তারিত ঘটনা জানায় ওই প্রতিবন্ধী কিশোরী। এ ব্যাপারে মেয়ের পরিবার স্থানীয় সাবেক এক চেয়ারম্যানের কাছে জানায়। তিনি গৌরীঘোনা বাজারে মিতালী সংঘ নামে একটি ক্লাবে এবিষয়ে অভিযোগ করতে বলেন।

অভিযোগের পর ওই ক্লাবে বসেই ঘটনাটি মিমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সময় ওই চেয়ারম্যানের ভাইপো শফিকুল ইসলাম ধর্ষকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেন। এক পর্যায়ে প্রায় দেড় লক্ষাধিক টাকার মাধ্যমে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়া হয়। রবিবার রাতে সালিশের নামে এলাকার মাতব্বররা গোপনে মোটা অংকের টাকা নেয় ইউনুস ফকিরের কাছ থেকে। পরে ভুক্তভোগী গরিব প্রতিবন্ধী কিশোরীর পরিবারকে নামমাত্র টাকা দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন ধর্ষিতার পরিবার।

জরিমানার অর্ধেকের বেশী টাকা মাতবারদের পকেটে গেছে বলে জানা গেছে। তারা বলেন, এলাকার মাতব্বর শফিকুল ইসলাম, আবু সাঈদসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বিভিন্ন ভাবে আমাদেরকে চাপ প্রয়োগ করে থানায় অভিযোগ দিতে দেয়নি এবং রবিবার রাতে সালিশ করে ধর্ষক ইউনুস ফকিরকে জরিমানা করেন। কিশোরীর স্বজন ও একাধিক এলাকাবাসীর অভিযোগ, ধর্ষক ইউনুস ফকিরকে বাঁচাতে আপোস-মীমাংসার জন্য চাপ দেয় স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন। এরপর থেকে বিভিন্ন হুমকি আর ও ভয়ভীতি দেখাতে থাকেন ধর্ষকের স্বজন ও প্রভাবশালীরা। এক পর্যায়ে ধর্ষণের ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অব্যাহত হুমকির মুখে মামলা না করে

মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কিশোরীটির পরিবার। গৌরীঘোনা ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এব্যাপারে গৌরীঘোনা ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ঘটনা সত্য, তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে আমার কাছে অভিযোগ না করায় আইনগত কোন ব্যবস্থা নিতে পারিনি। শুনেছি মিতালী সমাজ সেবা সংঘ নামে একটি ক্লাবে বসেই সালিশের নামে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। তারপরও আমি ঘটনা জানতে পেরে ভেরচী পুলিশ ক্যাম্পের আইসিকে জানিয়েছি। তিনি আরও জানান, এলাকার বিভিন্ন অপকর্ম নিয়ে ওই ক্লাবে সালিশ বিচার করা হয়।

সেখানে জুয়ার আসরও বসানো হয় বলে শুনেছি। সাবেক এক চেয়ারম্যানের অনুসারীরা যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং এক সাংবাদিককে ডেকে ধর্ষণের বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ধর্ষিতার পিতা মনিরুল ইসলাম সরদার গৌরীঘোনা বাজারে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন। গৌরীঘোনা বাজার কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মেয়ের পিতা সাংবাদিক সম্মেলন করবে বলে আমাকে ডেকেছিল। আমি সেখানে হাজির ছিলাম। এব্যাপারে সরাসরি বিএনপি নেতা ইউনুস ফকির কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিবন্ধীকে আমি ধর্ষণ করেনি। ওই দিন খেলা দেখতে গিয়েছিলাম।

মেয়ের পিতার সঙ্গে শেয়ারে ব্যবসা থাকায় আমি তার নিকট ৫৬ হাজার টাকা পাই। সেই টাকা চাওয়ায় আমার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে এলাকা মিথ্যা প্রচার ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আমি কোন সালিশ বৈঠকে হাজির হয়নি। আমার কাছে ধর্ষণের বিষয়টি যে দেড়লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে সেটা সম্পর্ণ বানোয়াট। ধর্ষিতার মা বলেন, আমার মেয়েকে ইউনুস ফকির ধর্ষণ করেনি। এলাকায় আমার মেয়েকে নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে কিছু লোকজন। সাংবাদিক সম্মেলনের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মেয়ের বিরুদ্ধে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বলে মানসম্মান বাঁচানোর জন্য এই সংবাদ সম্মেলন করেছি। এব্যাপারে ভেরচী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক তারিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি পুরানো, এব্যাপারে মেয়ের পিতা আমার কাছে কোন অভিযোগ দায়ের করেনি।