করোনায় চাকরীজীবী বেকার শিক্ষকদের মানবেতর জীবণ

কলারোয়ার বোয়ালিয়া মুক্তিযোদ্ধা কলেজের ডিগ্রি স্তরে বেতনের দাবি।

48

জুলফিকার আলী, কলারোয়া প্রতিনিধি ।। বছরের পর বেতন না পেয়ে এমনিতেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন এমপিওভূক্ত কলেজের ডিগ্রি পর্যায়ের ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। এর উপর মরার উপর খাড়ার ঘা হয়েছে বৈশ্বিক করোনা ভাইরাসের মহামারীকরোনা পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার সর্বমহলে আর্থিক সহযোগিতা, প্রণোদনা ও অন্যান সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন।

এখানেও বঞ্চিত ও পর্দার অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে এসকল শিক্ষক-কর্মচারীরা। না পাচ্ছেন হাত পাততে, না পাচ্ছেন কাউকে বলতে, না পাচ্ছেন অপ্রকাশ্যেও কোন সহায়তা। তবে এরূপ সহায়তা চান কলেজের ননএমপিও কোন শিক্ষক-কর্মচারীরা। তারা চান বেতন-ভাতা। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বোয়ালিয়া মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজটি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত এমপিওভূক্ত। তবে ননএমপিও ডিগ্রি স্তর। ৭টি বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যায়ের অধিভুক্ত, বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত (ননএমপিও) ডিগ্রি স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘ ৮বছর যাবত বিনা বেতনে চাকরী করছেন। পাঠদান, পরীক্ষাসহ একাডেমিক সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেন তারা। উচ্চ মাধ্যমিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার খাতার পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষকরা।

সবমিলিয়ে পরিপূর্ণ দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করলেও বেতন পান না শিক্ষকরা। এমনকি এসকল শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবছর প্রায় ৫হাজার টাকা করে শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পান। অথচ শিক্ষকরা কাজ করেও কোন বেতনভাতা পান না। একই কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতিমাসে বেতন পেলেও হাতশুন্য ও মলিন মুখে থাকতে হয় ডিগ্রি স্তরের কর্মরতদের। যেনে দ্বি-মুখি ব্যবস্থাপনা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তার আর পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে এসকল শিক্ষকরা নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম বিলিয়ে দিচ্ছেন উজাড় করে। মফস্বলের প্রত্যন্ত এলাকার এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হয় না কোন মাসিক বেতনও। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠান থেকে কোন টাকা-পয়সাও পান না শিক্ষক-কর্মচারী। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী সর্বকালের সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধাদের নামে প্রতিষ্ঠিত বোয়ালিয়া মুক্তিযোদ্ধা কলেজটির পথচলা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে।

একটি ৩তলা ও একটি ১তলা ভবন আছে। উচ্চ-মাধ্যমিক, বিএম ও ডিগ্রি মিলিয়ে বর্তমানে এই কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫শতাধিক। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ৫৬ জন। ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষার্থী রয়েছে শতাধিক। এই স্তরের শিক্ষক ৭জন ও কর্মচারী ৬জন। ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা আজো পান না সরকারি কোনো অনুদান, প্রতিষ্ঠান থেকেও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না। সংসার চালানোর তাগিদে অনেক শিক্ষক টিউশনি, কেউ দোকান-ব্যবসা আবার কেউ কৃষিকাজ বা অন্যান্য কাজের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে কোভিড-১৯ তথা করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে জাতীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারাদেশের মত কলারোয়াতেও এসকল শিক্ষককে নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করতে হচ্ছে।

আবার সম্মান রক্ষার্থে তারা কারোর কাছে হাত পাততেও পারছেন না বা পাতবেনও না। এতে শিক্ষকরা এক নিদারুণ মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের একটাই দাবি এমপিওভূক্ত করা হোক অর্থাৎ বেতনভাতা দেয়া হোক। তাহলে সংকটকালীন সময়ে তারাই সাধ্যমতো অন্যের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ফারুক হোসেন বলেন, ‘মফস্বল গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থীরা কোনো বেতন দেয় না। তাই ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদেরও কলেজ থেকে কোন বেতন-ভাতা দিতে পারি না। আমাদের কলেজের ফলাফল ভালো।

এরপরও ডিগ্রি পর্যায়ে এমপিওভুক্তিতে স্থান পায়নি। প্রায় দেড় মাসের মতো কলেজ বন্ধ। এসকল শিক্ষক-কর্মচারীরা অন্য যে কাজ করত তাও বন্ধ রয়েছে। কারো কাছে হাত পাততে পারবে না, পাতবেও না। শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের এমপিওভূক্ত করণ করা জরুরী। আক্ষেপের সুরে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী বলেন- ‘সম্ভবত বাংলাদেশেই সম্ভব যে, চাকরী করে বেতন পাওয়া যায় না। আমরা চাকরীজীবী বেকার। গ্রামের সন্তানদের দেশসেরা মানুষ বানাতে সারাক্ষণ মেধা-পরিশ্রম দিয়ে মাসশেষে নিজের হাড়ি শুন্য রেখে আফসোসের দরিয়ায় সাতার কাটি। স্ত্রী-সন্তানদের মুখগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায় আমরা কোনো এক আজন্ম পাপিষ্ট কপর্দকহীন মানুষ। ‘করোনার ক্রান্তিকালে আমরা ত্রাণের সাহায্য চাই না, আমরা চাই বেতন’ -যোগ করেন তারা।