একজন শিক্ষানুরাগী উদ্যোক্তার গল্প

16

মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ প্রতিনিধিঃ নওগাঁ জেলার প্রত্যন্ত ও বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ামতপুর উপজেলা। এই একবিংশ শতাব্দিতে এসেও এ এলাকার মানুষ অন্যান্য সকল সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষা দিক্ষায় অনেক পিছিয়ে।

এ জনপদের অনগ্রসর জনগোষ্ঠিকে জ্ঞানের আলোই দিক্ষিত করে সামনে নিতে বহুমূখী ভাবনার পাশাপাশি নানাবিধ কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকেন উপজেলা সদর থেকে অদুরে প্রত্যন্ত মায়ামারী গ্রামের কর্মশক্তি সম্পন্ন যুবক শাহজাহান শাজু।

এরই মধ্যে অনেক অভাব অনটন উপেক্ষা করে লেখা পড়ার পাঠ চুকিয়ে একসময় তিনি জীবন জীবীকার তাগিতে ঢাকামূখী হলেও ভাবতেন নিয়ামতপুরের মানুষদের কথা। এসব সহজ সরল মানুষদের জীবনমান উন্নয়ন ও পরবর্তী প্রজন্মের উজ্জল ভবিষ্যৎ গড়তে একান্তই মাটির টানে ফিরে আসেন শিকড়ে। স্বপ্ন দেখেন একটি আদর্শ স্কুল গড়ার। এলাকার কিছু শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের চিন্তা করে তাদেরকে নিয়ে শুরু করলেন তার স্বপ্নের স্কুল গড়ার কাজ। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টা ও এলাকার সকল শ্রেণীর মানুষের সহযোগীতায় গড়তে গেলেন স্কুল। নাম দিলেন নিয়ামতপুর কিন্ডার গার্টেন স্কুল।

শাহজাহান শাজু নিজ প্রচেষ্টায় খোলামেলা জায়গায় মনোরম পরিবেশে স্কুলের অবকাঠামো তৈরীর পর শুরু হলো ছাত্র সংগ্রহ ও অভিবভাকদের বুঝানোর কাজ। যদিও কাজটি ছিল খুবই জটিল তবুও তিনি মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয় করলেন মানুষের মন। মানুষের দারে দারে গিয়ে অভিভাবকদের বুঝাতেন, ছেলেমেয়েদের দীর্ঘ পথচলা সুন্দর আর সুগম করতে হলে লেখাপড়া বিকল্প নেই। নিয়ামতপুরে ২০০৭ সালে অনেক বুঝিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাত্র ১৩জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে প্রথমবারের মত শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শুরু হলো কিন্ডার গার্টেনের পথ চলা।

১৩জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে বেশীর ভাগই ছিল অবহেলীত ও আদিবাসী। ২০০৯ সালে প্রথম প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় প্রথম অংশগ্রহন করার সুযোগ পায় এ স্কুল। এসময় ৩ জন ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে। এর মধ্যে ৩জনই এ+ পায়। উপজেলা মেধা তালিকায় দু’জন ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ স্থান অধিকার করে। শুধু তাই নয়, শুরু থেকে অদ্যবদি উপজেলায় ভাল ফলাফল অর্জনে উপজেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে আসছে এই স্কুল। লেখা পড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা মেধার বিকাশ ঘটাতে থাকে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যেতে পারে “২০১৩সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগীতায় শ্রী রাসেল লাকড়া নামের এক ছাত্র উচ্চ লম্ফ ও দীর্ঘ লম্ফ ইভেন্টে জাতীয় পর্যায়ে দু’টি গোল্ড মেডেল অর্জন করে”।

প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শাহজাহান শাজুর উদ্যোমী কর্মকান্ড এবং সাহসী পদক্ষেপে প্রতিষ্ঠানটি অতি অল্প সময়েই অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করে। তিনি তার মেধা পরিশ্রম ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয় করতে সক্ষম হন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, প্রশাসন, সর্বোপরি সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মন।
নিয়ামতপুর উপজেলায় মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস বিশেষ ভাবে লক্ষনীয়। এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের সুবিধা বঞ্চিত মেধাবী ছেলে-মেয়েদের সহ সকল সম্প্রদায়ের অতিদরিদ্র মেধাবী সন্ত¦ানদের ঝরে পড়া রোধ করে সুষ্ঠ ভাবে শিক্ষা গ্রহনের জন্য তিনি তার প্রতিষ্ঠানে যাবতীয় সুযোগসুবিধা প্রদান করেন।

বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ, লেখা পড়ার মান নিশ্চিতকরণ, মাননীয় প্রধান মন্ত্রি শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচলনা করে থাকেন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। ইতি মধ্যে স্কুলটি সফলতার সাথে ১যুগ পেরিয়ে গেছে। শিক্ষক, ছাত্র ও অভিভাবকদের নিয়ে সম্বলিত মতবিনিময় এবং তাদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ ও মতামতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলায় এলাকা বাসীর নজর কাড়ে। সেই নিয়ামতপুরে শাহজাহান শাজুকে অনুকরণ, অনুস্মরণ করে গড়ে উঠতে শুরু করল একের পর এক স্কুল।

শুধু স্কুল পরিচালনা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি তাকে এলাকায় বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সহোযোগীতা ও সবসময় দরিদ্র মানুষের পাশে এসে সেবায় নিজেকে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়।

নিয়ামতপুর সরকারী বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসর প্রাপ্ত সিনিয়র ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আলহাজ্ব ইনছান আলী এ প্রতিবেদককে জানান, শাহজাহান শাজুর উদ্যোমী কর্মকান্ড এবং সাহসী পদক্ষেপ আমাদের এলাকায় খুব লক্ষনীয়। আমি তাকে ছোট থেকেই চিনি এবং সে এর আগেও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে ব্যার্থ হয়। এর পরও সে হাল ছাড়িনি, অবশেষে ২০০৭ সালে গড়ল নিয়ামতপুর কিন্ডার গার্টেন স্কুল। এটি নিয়ামতপুরে একক প্রচেষ্টায় প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠি ও ঝরে পড়া ছাত্রদের নিয়ে শুরু করে এই স্কুল এবং এ স্কুলের ফলাফল বরাবরই ভাল। আমি তার সার্বিক মঙ্গল কামনা করি।

ভাবিচা ঝলঝলিয়া গ্রামের ছাত্র অভিভাবক আব্দুস সালাম বলেন, আমার মেয়ের লেখাপড়া প্রায় অনিশ্চিত ছিল, তখন আমার বাড়িতে হাজির হয় শাহজাহান শাজু, বলে আপনার মেয়েকে আমি পড়াব এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়তে চাই। শুনে বললাম আমার তো পড়াশুনা করানোর মতো টাকা নেই, কিভাবে পড়াব? এমনিতেই তিনবেলা ঠিকমতো খেতে পারিনা। তিনি আমাকে বললেন আপনার মেয়ের পড়ালেখার দ্বায়িত্ব এখন আমার, সে নিয়ামতপুর কিন্ডার গার্টেন স্কুলে লেখাপড়া করবে। এভাবে তিনি এলাকার অনেক দরিদ্র ও আদিবাসি ছেলে-মেয়েদেরকে স্কুল মুখী করেছেন বলে আমার জানা। আমার মেয়ে ১ম শ্রেণী থেকে নিয়ামতপুর কিন্ডার গার্টেন স্কুলে পড়ছে। সে ৫ম শ্রেণীতে এ+সহ বৃত্তি, ৮ম শ্রেণীতে এ+ পায়। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় লেখা-পড়ার মান ও অভিভাবকদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ ও মতামত সবসময়ই গ্রহন করতেন। আমি নিয়ামতপুর কিন্ডার গার্টেন স্কুলের উত্তর উত্তর উন্নতি কামনা করছি।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফরিদ আহম্মেদ জানান, আমার জানা মতে নিয়ামতপুর কিন্ডার গার্টেন স্কুলের ফলাফল খুব ভাল ও প্রশংসনীয়। স্কুলের উদ্যাক্তা শাহজাহান শাজু অত্যান্ত পরিশ্রমী, বিনয়ী এবং দক্ষতার সহিত স্কুল পরিচালনা করে আসছে । নিয়ামতপুরে তাকে অনুসরণ করে এখন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মঙ্গল কামনা করছি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়া মারিয়া পেরেরা বলেন, আমি নিয়ামতপুর কিন্ডার গার্টেন স্কুলে গিয়েছি এবং স্কুলের পরিবেশটি শিক্ষা বান্ধব। আমি নিয়ামতপুর আসার পর থেকেই শুনেছি এ স্কুলের ফলাফল অনেক ভাল এবং প্রশংসনীয়। স্কুলের উদ্যাক্তা শাহজাহান শাজু অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমী, দিন-রাত নিরলস ভাবে শ্রম দিয়ে এ প্রতিষ্ঠান তিনি গড়েছেন ।

তার স্বপ্ন নিয়ে শাহজাহান শাজু এ প্রতিবেদকে জানান, আমি আমার জন্মস্থান নিয়ামতপুরকে ভালবাসি। তাই নিয়ামতপুরের মেহনতি মানুষের আগামী প্রজন্মের সন্তানদের জন্য ভাল কিছু করার স্পৃহা সবসময় মনেকে জাগিয়ে রাখে। সে চিন্তা-চেতনায় আমি স্কুলটি গড়েছি। তাই জীবনে স্বপ্ন দেখতে হবে। স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে হলে জীবনে গতি থাকতে হবে। গতির পাশাপাশি চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে। তবেই সম্ভব আগামীর উন্নত বাংলাদেশে অবদান রাখা। তিনি আরও বলেন, ভালবাসায় মানুষকে বাঁচতে শেখায়, পরিশ্রম মানুষকে হাসতে শেখায়।