সর্বশেষ সংবাদ

আর কত টাকা দরকার আপনাদের?

মো. জাবের হোসেন : টাকা ছাড়া দুনিয়া অচল! যেটি মানব জীবনে খুবই প্রয়োজন। টাকার জন্য কত কিছুই না করছি আমরা। প্রত্যাহ সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘুমানোর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কত পরিশ্রমই না করছি। কত টাকাই না রোজগার করছি আমরা। কেউ বৈধ পথে আবার কেউ অবৈধ পথে। ইসলামে ঘুষ-দুর্নীতি নিষিদ্ধ থাকলেও সবাই মুখে মুখে ছাড়া বাস্তবে আমরা খুব কম লোকই মান্য করি বিষয়টা।

মানুষ মাত্রই মরণশীল। আমাদের প্রত্যেকেরই একদিন না একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর মৃত্যুর পর পৃথীবিতে করা প্রত্যেকটি কাজের হিসাব দিতে হবে আমাদের। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বোঝাবার জন্যই কাউকে ধনী, আবার কাউকে ফকির করে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কেউ’বা হাজার টাকা নিয়ে শান্তিতে জীবনযাপন করছেন আবার কেউ’বা লক্ষ কোটি টাকা নিয়েও সুখি জীবনযাপন করতে পারছেন না। কারোর মাসে হাজার টাকা আয় করে দিব্যি ভালো চলছে সংসার। আবার কারোর লক্ষ-কোটি টাকা আয় করে মাস পার করতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এজন্যই মনে হয় কবি বলেছিলেন, “আমি যাহা চাই তাহা পাইনা,যাহা পায় তাহা চাইনা”। আমরা যে যার অবস্থানে আছি সে তার অবস্থান থেকে মটেও সুখি না। কারন আমদের পকেটে যদি ১ হাজার টাকার একটি নোট থাকে তাহলে মাথায় চিন্তা আসে কোথায় যাওয়া যায়? কি কেনা যায় বা কি খাওয়া যায়? ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ১ হাজার টাকার পরিবর্তে আপনার পকেটে যদি ১ শত টাকার একটি নোট থাকে তাহলে কিন্তু মাথায় এসব চিন্তা আসেনা। কারণটা হলো “সুখে থাকতে ভূতে কিলায়” প্রবাদটার মত স্বচ্ছ । আপনার পকেটে যত বেশি টাকা থাকবে আপনি তত বেশি ব্যস্থ হয়ে যাবেন। আর যত টাকা কম থাকবে তত ফ্রি থাকবেন। ইসলামে এটাও বলা রয়েছে , ইহকালে যার যেমন সম্পত্তি থাকবে ,পরকালে তার তেমন হিসাব দিতে হবে।

উপরের কথাগুলো না হয় বাদ’ই দিলাম। কারণ নীতি কথা থাকে বইয়ের পাতায়। সেটা এখন আর বাস্তবে নেই। নীতি জিনিষটা এখন দুষ্প্রাপ্য বস্তুতে পরিণত হয়ে গেছে। এখন নীতি আছে, নেই শুধু নৈতিকতা। সত্য আছে, নেই সত্যবাদি মানুষ। এখন শুধু নিজের ইহকাল গোঁছানোর জন্য সবাই ব্যস্থ থাকি। সেটা না হয় মানা যায়, যদি কিনা অবৈধ পথে আয় করা না হয়।

আমাদের গড় আয়ূ বর্তমানে ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের মানুষ এখন গড়ে ৭২ বছর বেঁচে থাকছে। একজন মানুষের গড়ে যদি মাসিক সর্বসাকূল্যে ২০ হাজার টাকা লাগে। তাহলে ৭২ বছরের জীবদ্দশায় ১৭,২৮০,০০০ টাকার প্রয়োজন পড়ে। আমি হিসাবটা শহরের ধরে করেছি। এই হিসাবে যদি একটি পরিবারে ৫ জন লোক থাকে তাহলে ৫২ বছরে ৮৬,৪০০,০০০ টাকার প্রয়োজন হয়। এর থেকেও যদি বেশি প্রয়োজন হয় তা না হয় মানলাম। কিন্তু একজন মানুষের বেঁচে থাকতে হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হয় কি জন্য সেটি আমার বৈধগম্য নয়! হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হয় আপনি বৈধ পথে অর্জন করুন। লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন হয় আপনি বৈধ পথে অর্জন করুন। কারোর কাছে আপনাকে মাথা নত করতে হবেনা। কেউ আপনার দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলার সাহস পাবেনা। কিন্তু আপনার হাজার কোটি টাকা যদি হয় অবৈধ পথের তাহলে তো মানুষ আপনার দিকে আঙ্গুল নেড়ে কথা বলবে। অর্থের জোরে না হয় আপনি টিকে যাবেন। কিন্তু যেদিন আপনার সময় ফুরিয়ে যাবে, যেদিন আপনার ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যাবে সেদিন আপনার অবস্থান কোথায় থাকবে?

একটি খরগোশ বাঁচে সাড়ে তিন শত বছর, শকুন পাঁচ শত বছর বাচেঁ। তাদের ভীতরে কিন্তু আমাদের মত এত সঞ্চয় করার প্রবণতা নেই, যতটা প্রবণতা আমাদের এই ৭২ বছরের জীবনে। এই প্রবণতা কিন্তু মাত্র কয়েকটি সেকেন্ডে বন্ধ হয়ে যায়, যখন আমাদের দেহ ঘড়িটা কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

আমরা অ্যাপলের নাম সবাই জানি। অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের নাম প্রায় সকলেই জানা। পৃথিবীর সেরা ধনীদের তালিকায় ছিলেন তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তিনি মৃত্যু শয্যায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে জীবন সম্পর্কে কিছু অসাধারণ কথা বলে গেছেন আমাদের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার জন্য। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারে মালিক হওয়া সত্তে¡ও তিনি বলেছিলেন,“শুধু টাকার পিছনে ছুঁটলে আমার (স্টিভ জবস্) মত এক ভ্রান্ত মানুষে পরিণত হতে হবে, টাকার পিছনে না ছুঁটে ভালোবাসাও খুঁজে নিতে হবে, কারণ টাকা সব সুখ দিতে পারেনা”।

আপনি যত টাকায় অর্জন করুন না কেনো জীবনের অন্তিম মুহূর্তে কোনো অর্থই কাজে লাগবেনা। লাগবে শুধু মানুষের ভালোবাসা আর আর্শিবাদ। বাস্তবে আমরা আমাদের চারিদিকে তাকালে অনেক নজীর দেখতে পাবো।

মীর মশাররফ হোসেন তার বিখ্যাত ‘বিষাধ সিন্ধু’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘হায়রে পাতকী অর্থ তুই জগতের সকল অনর্থের মূল’, বিশ্বকবি রবি ঠাকুর লিখেছেন ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভূরি ভূরি’। সরকারী চাকরি এখন সোনার হরিণ না, ডায়মন্ডের হরিণে পরিণত হয়ে গেছে। কারণটা সবার অজানা নয়!

এজন্যই বোধহয় দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গুবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘সবাই পেলো সোনার খনি ,আমি পেলাম চোরের খনি’। কথাটা যারা জানেন না তারা জেনে নিবেন কারোর কাছ থেকে। কারন আমি এখন এই কথাটার উদ্ধৃতি দিলাম এজন্য যে, জন্মগতভাবে আমরা অনেকটা মীর জাফর ধরণের। মুখে মুখে বলি দেশ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া হয়ে গেছে! একটি ছিদ্র বালতিতে আপনি যতই পানি ঢালুন না কেনো বালতি কখনোই ভরবেনা। আমাদের অবস্থাও ঠিক সেরকম। মুখে মুখে বলি দুর্নীতি বন্ধ করুন। পিছনে গিয়ে নিজেই সেইকাজে লিপ্ত হয়।

এ বছরে রুপপুর বালিশ কান্ড থেকে দুর্নীতির বড় খবর জানতে পারি আমরা। এরপর একের পর এক বের হয়েছে অস্বাভাবিক দুর্নীতির কান্ড! কখনোবা জানালার পর্দা কান্ড, কখনোবা বই কান্ড, টিন কান্ড, চেয়ার কান্ড ইত্যাদি। এভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে অস্বাভাবিক দুর্নীতি। আমার মনে হয় দুর্নীতিরও একটা সীমা থাকা উচিত! এরপর শুরু হয়েছে ক্যাসিনো কান্ড ! বাংলাদেশের মত এমন একটা দেশে পশ্চিমা দেশের আদলে শত শত ক্যাসিনো গড়ে উঠেছে সেটি ভাবলে মনে হয় আমরাও পশ্চিমা দেশে রুপান্তরিত হয়ে গেছি।

এত শত কোটি, হাজার কোটি টাকা দিয়ে আপনি কতদিন বেঁচে থাকতে পারবেন ? সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে কি টাকা দিয়ে আপনি আপনার জীবনের মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে পারবেন? কখনো পারবেন না। তাহলে কেনো দেশের টাকা অবৈধভাবে আপনি আপনার পকেটে ঢুকাচ্ছেন?

একটি টিনের দাম যদি ১ লাখ টাকা হয়! পুকুর খনন করতে প্রশিক্ষণ নিতে যদি বিদেশ যাওয়া লাগে! মশার মারা ওষুধ ছিটানোর জন্য যদি প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশ যেতে হয়! জানালার পর্দার দাম যদি লাখ টাকা হয় তাহলে সাধারণ জনগন কোথায় যাবে ?

এর থেকে ভালো হয় যারা সরকারী চাকরি বা বে-সরকারী চাকরি করছেন তাদের মধ্য থেকে যারা দুর্নীতি করার ইচ্ছা আছে তাদের একটা লিস্ট করুন। লিস্টে কার কত টাকার চাহিদা সেটা লিখতে বলুন । প্রয়োজনে সাধারণ জনগন তাদের নিজস্ব টাকা দিয়ে একটি ফান্ড তৈরি করবে। সেখান থেকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দেয়া হবে। তবুও আপনারা দুর্নীতি বন্ধ করুন। দেশ ও দেশের জনগনকে মুক্তি দিন।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, লাল সবুজের কথা। ই-মেইল : zaberhossen94@gmail.com

error: লাল সবুজের কথা !!